
কুমিল্লা: কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে (১৫) হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গত শনিবার সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া এই তথ্য জানান। পুলিশ জানিয়েছে, আসামির দেখানো স্থান থেকে নিহত কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে এবং আসামি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। তবে ৮ কিলোমিটার দূরত্বের গন্তব্যে যেতে ৩০ কিলোমিটার ঘুরিয়ে নির্জন মাঠে নিয়ে যাওয়ার কারণসহ এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো রহস্য বা অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
পুলিশের তদন্ত ও সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের কাছে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল ওই কিশোরী। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুমন মিয়ার অটোরিকশায় ওঠে সে। পদুয়ার বাজার থেকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার দূরত্ব মাত্র আট কিলোমিটার হলেও, চালক সুমন প্রথমে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিজরা বাজার এবং পরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে লালমাইয়ের ভোরাজগৎপুরের ফসলের মাঠের দিকে যান। এই পথে দূরত্ব অন্তত ৩০ কিলোমিটার। অটোরিকশায় প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে নেওয়ার পর ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে গত বৃহস্পতিবার সকালে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় মরদেহের গলায় গামছা পেঁচানো ছিল এবং পাশে একটি হাতব্যাগ পাওয়া যায়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানিয়েছেন, পদুয়ার বাজার থেকে কিশোরীর বাসায় যেতে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা লাগার কথা। অথচ তাকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। মেয়েটি যদি ঘটনাস্থলে বা এর আগে অন্তত ৯৯৯-এ কল দিত, তাহলে হয়তো এমন পরিণতি দেখতে হতো না।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন দাবি করেছেন যে, নির্জন জায়গায় পৌঁছানোর পর কিশোরী পালানোর চেষ্টা করলে তিনি তাকে আটকাতে ধস্তাধস্তি করেন এবং পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের সময়গুলোতে অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়েছে। ঘটনার দিন রাত ২টা ৫৮ মিনিটে কিশোরী তার বাবাকে একটি 'লাইভ লোকেশন' পাঠিয়েছিল, যা ঘুমে থাকা বাবা সকালে দেখেন। কিন্তু ওই লোকেশন পাঠানোর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং সেই মুহূর্তে কিশোরী কোনো বিপদের আশঙ্কা করছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেনি। এছাড়া ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হয়ে কিশোরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজার ঘুরে কীভাবে ওই দিন রাতে কুমিল্লায় ফিরল এবং এই চার দিনে পরিবার কেন থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেনি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, কিশোরীর মা তার মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় এক অজ্ঞাত বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন।
মহাসড়কে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং রাতের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এই ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগেও গত ২৪ এপ্রিল রাতে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী বাস থেকে নামার পর সংঘবদ্ধ সিএনজি অটোরিকশা চক্রের ফাঁদে পড়ে নিহত হয়েছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুমন মিয়াকে চট্টগ্রামে পালিয়ে যাওয়ার পর গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাখরাবাদ এলাকা থেকে কিশোরীর আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও ধর্ষণের সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অন্য কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।