সংক্ষেপে মূল তথ্য
- মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
- জবাবে 'ফাদার অব অল বম্বস' দেখানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
- পাল্টাপাল্টি হুমকিতে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এমনটাই জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন। জবাবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের 'মাদার অব অল বম্বসে'র জবাবে ইরান দেখাবে 'ফাদার অব অল বম্বস'। পাল্টাপাল্টি এই হুমকিতে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা আবার তুঙ্গে উঠেছে।
মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনা সম্পর্কে অবহিত একাধিক সূত্রের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, দুই দেশের সামরিক বাহিনী ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার লক্ষ্য করে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র একটি অভিযানের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরই মধ্যে মহড়া জোরদার করা হয়েছে। হামলার মহড়া হিসেবে ইরাকের আকাশে বিমান উড়িয়েছে দুই দেশের বাহিনী।
এই সপ্তাহে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ। সেখানেই নতুন করে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিবেদন। প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাতের পর কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, আরেক দফা হামলা ইরানের অর্থনীতিকে ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে এবং কূটনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে তেহরানকে।
তবে হামলার সম্ভাবনার মধ্যেই ইরান সতর্ক করেছে, নতুন করে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হবে। ইরানের রাষ্ট্র-সমর্থিত সংবাদমাধ্যম স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্কের বরাতে জানা গেছে, আইআরজিসির মুখপাত্র মোহেব্বি বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রের কাছে 'মাদার অব অল বম্বস' আছে। আমরা তাদের 'ফাদার অব অল বম্বস' দেখাব, এবং সেটা অবশ্যই তাদের জন্য নতুন কিছু হবে।" তবে এই অস্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি তেহরান।
এর আগে খবর এসেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পারমাণবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৪৩/বি মাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করেছেন, যা 'মাদার অব অল বম্বস' নামে পরিচিত। কিন্তু অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, ভূপৃষ্ঠের ওপরে বিস্ফোরিত এই বোমা গ্রানাইট পাথরে গড়া ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে পারবে কি না। সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বোমাটি বহন করতে হবে ধীরগতির এমসি-১৩০ পরিবহন বিমানে, যা ইরানের বিমানবিধ্বংসী গোলার মুখে ঝুঁকিপূর্ণ।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রশাসন "আছে বা নেই, এমন" সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করে না। তবে ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেজন্য সব বিকল্প টেবিলে রাখছেন ট্রাম্প। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের শুরু নাগাদ তিনটি বিমানবাহী রণতরী, হাজার হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ অভিযান বাহিনী নিয়ে একটি বড় সামরিক শক্তি মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায়, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না করার ট্রাম্পের আগের প্রতিশ্রুতির কারণে অভিযান বিলম্বিত হতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পরিস্থিতিকে তেহরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি খুব ভালো ছিল, ইরান কিছুই ছাড় দেয়নি। তার ভাষায়, "আমরা এখন চ্যালেঞ্জে নয়, সুপার-চ্যালেঞ্জে আছি। চাপ ও যুদ্ধ সত্ত্বেও আমরা দৃঢ় থাকব ভাবেনি আমেরিকা, কিন্তু আমরা দৃঢ় ছিলাম এবং থাকব।"
ইরানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়েছে স্টারলিংক। তার দাবি, হামলায় দেশটির মহাকাশ ও বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর বাইরে ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রের নিচের ইন্টারনেট কেবল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তাদের ভাষায়, লড়াই হবে না দ্রুত, না সীমিত।
ইরানের আলোচক জেনারেল মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি বলেছেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরেক দফা হামলা শেষ করা যাবে, এমন ধারণা "কল্পনা" মাত্র। ইরানই ঠিক করবে যুদ্ধ কখন শেষ হবে। তার ভাষায়, "আমাদের হামলা হবে আরও তীব্র, সৃজনশীল ও ভিন্ন। আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী এবং শক্তিশালী পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুত।"
এই পরিস্থিতিতে বুধবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা হোসেইনি খামেনি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয় এবং ইরানের শক্তির উৎস জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হয়। কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিনদের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন গালিবাফ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন অভিযানের সময়সূচিকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু হেরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হলে যুদ্ধ শুরু করা তার জন্য কঠিন হবে। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, যৌথ হামলার সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ঐক্য সরকারে চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।
সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা দুটোই চলমান থাকায় বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে এবং ইরান কীভাবে জবাব দেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।