
ঢাকা: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন বেতন দাঁড়াবে ভাতাসহ ৩৩ হাজার টাকার কিছু বেশি এবং গাড়িসুবিধা ছাড়া সর্বোচ্চ বেতন হবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। গত ১ জুলাই থেকে এই নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা বলা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সুবিধা পেতে চাকরিজীবীদের আরও দেড় বছর অপেক্ষা করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার অর্থ বিভাগের অর্থ বিভাগ ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করে, যা গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে গত ৩১ আগস্ট এই নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল।
১১ বছর পর নতুন এই বেতনকাঠামো জারি করা হলো। এর আগে এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিবছর ৫ শতাংশ করে বেতন বাড়ানো হয়েছিল। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন বা নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য তা ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন অনলাইনে নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য সরকারের আইবাস প্লাস প্লাসের পে ফিক্সেশন অপশনে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন করতে হবে।
নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও ওই দিন থেকেই সরকারি কর্মচারীরা পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হবে। এর মধ্যে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ প্রাপ্ত বেতনের সঙ্গে যোগ করে পাবেন। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা ৭০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। সবশেষে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গেই বকেয়া পরিশোধ করা হবে।
নতুন কাঠামোয় সরকারি চাকরির আগের ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম বা সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকার সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মুঠোফোন ভাতা যোগ হয়ে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার জন্য ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া ধরা হওয়ায় মোট বেতন হবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা। বিশেষ গ্রেডে সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকার সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা যোগ হয়ে মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর বাইরে তাঁরা সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধাসহ অন্যান্য বিশেষ সুবিধা পাবেন। এছাড়া বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেওয়া তরুণ কর্মকর্তাদের ৯ম গ্রেডে মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা এবং এই গ্রেডে সর্বনিম্ন মোট বেতন হবে ৬০ হাজার টাকার কিছু বেশি। অবসর নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনও পাঁচটি স্তরে বাড়ানো হয়েছে, যেখানে কম পেনশনভোগীদের বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। তবে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য নতুন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বড় ধরনের অর্থায়ন বা বাজেট ঘাটতির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, দেড় দুই বছরে রাজস্ব আয় এত না বাড়লে এই বিপুল অর্থায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে। ঘাটতি মেটাতে সরকার ঋণ নিলে বা টাকা ছাপাতে বাধ্য হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পরবর্তী আর্থিক ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, সেদিকেই এখন সবার নজর রয়েছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।