|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক কেন: ইতিহাস, রাজনীতি ও বিদ্বেষের অন্দরমহল

0 শেয়ার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা
সংক্ষেপে মূল তথ্য
  • রবীন্দ্রবিরোধিতার পেছনে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকীর্ণতা কাজ করছে।
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা নিয়ে ছড়ানো প্রোপাগান্ডা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
  • অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সত্তাকে গুঁড়িয়ে দিতেই এই অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ঢাকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে এই বঙ্গে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ সাহিত্যিক মতপার্থক্য নয়। প্রশ্ন জাগে, যাঁকে বাদ দিয়ে বাংলার ইতিহাস বা সাহিত্য ভাবাই যায় না, তাঁকে নিয়ে এত বিদ্বেষ কেন? কারা আসলে চায় না রবীন্দ্রনাথ এ দেশের মানুষের চেতনায় সজীব থাকুন? এ প্রশ্নের উত্তর যতটা সাহিত্যের পাতায় আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব আর রাজনীতির গভীর অন্দরে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত এই রবীন্দ্রবিরোধিতার নানা রূপ ও কারণ নিয়ে চলছে দীর্ঘ আলোচনা।

নারী ও শিশুর সহিংসতা রোধে জিরো টলারেন্স নীতি চান রাষ্ট্রপতি

ঔপনিবেশিক বাংলার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথকে অনেকেই জোড়াসাঁকোর জমিদার হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান। শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের জমিদারির দায়িত্ব সামলালেও প্রজাসাধারণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পদ্মার রূপ ও মানুষের হাহাকার তাঁকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছিল। পতিসরের সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা কিংবা নোবেল পুরস্কারের অর্থ কৃষকদের কল্যাণে উৎসর্গ করার মতো ঘটনা প্রমাণ করে, প্রজার অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতি তিনি কতটা সংবেদনশীল ছিলেন। তবে বিশ শতকের প্রথমার্ধে পূর্ববঙ্গে উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ যখন ব্রিটিশ আমলের বঞ্চনার শিকার হয়ে নিজেদের শিকড় খুঁজছিল, তখন কলকাতার বাবু সংস্কৃতিকে কুলীন সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে দেখা শুরু হয়। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থান্বেষী মহল এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে রবীন্দ্রনাথকে সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়।

ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার স্বরূপ

রবীন্দ্রবিরোধিতার এই রাজনৈতিক খেলায় সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা। কট্টরপন্থী শক্তিগুলো সমাজকে প্রশ্নহীন শৃঙ্খলে আটকে রাখতে চায়, অথচ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শনজুড়ে রয়েছে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন ও মুক্তির জয়গান। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকসহ প্রাজ্ঞজনেরা বারবার বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। কিন্তু উগ্র শক্তি এই সত্য চেপে গিয়ে তাঁকে নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বন্দী করতে চায়। পাকিস্তান আমলেও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বাঙালি জাতিকে সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে গান প্রচার নিষিদ্ধ করেছিল। ১৯৬১ সালে আইয়ুব খানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে উদযাপিত রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধেরই ঐতিহাসিক মাইলফলক।

বিজ্ঞাপন
Advertisement
রবীন্দ্রনাথ কেবল অতীতের কোনো পুরোনো ধুলোমাখা নাম নন; তিনি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের এমন এক শিকড়, যাঁকে অস্বীকার করার অর্থ নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।

আরেকটি বড় মিথ বা প্রোপাগান্ডা হলো রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’ সাক্ষ্য দেয় যে, ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনার সময় রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের পদ্মার বোটে নিভৃতে সাহিত্যচর্চায় মগ্ন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে কার্জন হলে সংবর্ধনা ও ডি-লিট উপাধি দেয়। এমনকি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বিশ্বভারতীর ট্রাস্টি করার ইতিহাসও এ দেশের শিক্ষাঙ্গনের প্রতি তাঁর Anurager প্রমাণ দেয়। অথচ এ সত্যগুলোকে আড়াল করে একশ্রেণির প্রোপাগান্ডিস্ট তরুণদের মনে কৃত্রিম ঘৃণা তৈরি করতে চায়। আজকের ডিজিটাল যুগে ফেসবুকের রিলস ও ভুয়া পোস্টের মাধ্যমে এই রবীন্দ্রবিদ্বেষকে আরও সুকৌশলে তরুণ প্রজন্মের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব: আজকের স্বাধীন বাংলাদেশেও পাকিস্তান আমলের সেই পুরোনো বয়ান নতুন বোতলে ফিরে আসছে। ভাস্কর্য ভাঙচুর কিংবা শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি লেপনের ঘটনা প্রমাণ করে কূপমণ্ডূকতা আজও মরেনি। এই ধ্যানধারণা আমাদের মাতৃভাষা ও বহুত্ববাদী বাঙালি সত্তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। অন্ধ বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার কুয়াশা ভেদ করে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও চেতনার আলোয় এই চক্রান্ত মোকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি।

Dhaka Story
Dhaka Storyভেরিফাইড

ঢাকা স্টোরি সততা ও সত্যতা যাচাই নীতিমালার অধীনে খবর প্রকাশ করে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিজ্ঞাপন

Advertisement
Advertisement
বিজ্ঞাপন
Advertisement
Dhaka Story
ঢাকা স্টোরি
তাত্ক্ষণিক নিউজ আপডেট

ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।