
সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে পাকিস্তান। গত বছর রিয়াদে স্বাক্ষরিত এবং পরবর্তীতে তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত এই চুক্তিকে বলা হচ্ছে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের ওপর সামরিক সহায়তার বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদে নগদ অর্থের সংকটে থাকা পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও বিনিয়োগের চুক্তি করে। এর বিনিময়ে পাকিস্তান সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সৌদির ভূখণ্ডে হামলা হলে প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেয়। তখন মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলে এই আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতা ও এর সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়টি সামনে চলে আসে।
আমি মনে করি না, আসিম মুনির ওই অঞ্চলের মুখোমুখি হওয়া হুমকিগুলো যথাযথভাবে হিসাব করেছিলেন। পাকিস্তান হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিলে এর বড় ধরনের পরিণতি হতে পারে। - আয়েশা সিদ্দিকা, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সিনিয়র ফেলো, কিংস কলেজ লন্ডন
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বহুমুখী সংঘাতের বাস্তব চিত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করেই পাকিস্তান এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে জড়িয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত এবং আফগান তালেবানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক প্রায় যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। এছাড়া বেলুচিস্তানসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমন বাস্তবতায় মক্কা চুক্তি সক্রিয় হলে পাকিস্তানের শিয়া জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটে দেশের ভেতরে বড় ধরনের ধর্মীয় বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানের সিনেটে বিরোধীদলীয় নেতা রাজা নাসির আব্বাস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, এই চুক্তির প্রকৃত শর্ত ও সমঝোতা সম্পর্কে সামরিক নেতৃত্বের বাইরে খুব কম মানুষই অবগত আছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, এই সংঘাতে সৌদির পক্ষ নিলে দেশ চরম অস্থিতিশীলতার মুখে পড়বে। যদিও পাকিস্তানের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন যে মার্কিন অনুমোদন ছাড়া সৌদি আরব এখনই হুতিদের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করবে না, তবুও বৈশ্বিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মাঝে পাকিস্তানের এই অবস্থান ইসলামাবাদকে এক কঠিন ভূরাজনৈতিক ফাঁদে ফেলে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।