
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নাসিমা খান ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'কার বউ' চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় পরিচালক নজরুল ইসলামের অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সে সময় আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, পরবর্তী তিন দিন তিনি বিছানা থেকে নড়াচড়া করতে পারেননি। অথচ ক্যামেরার পেছনে থাকা কলাকুশলীরা দৃশ্যটি দারুণভাবে ধারণ করায় তখন আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ৮২ বছর বয়সে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর প্রয়াণে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
১৯৯০ সালে 'সাপ্তাহিক বিচিত্রা'র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত এক আত্মকথনে নিজের অভিনয়জীবনের এই রোমহর্ষক ও অজানা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন নাসিমা খান। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা পরে পুনঃপ্রকাশ করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিনেত্রী জানিয়েছিলেন, স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনার খবর শুনে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে যাওয়ার একটি দৃশ্যে অভিনয় করছিলেন তিনি। দৃশ্যটি বুঝিয়ে দেওয়ার সময় পরিচালক নজরুল ইসলাম তাঁকে জানাননি যে বাস্তবেও এমন আকস্মিক ধাক্কা দেওয়া হবে। হুট করে দেওয়া সেই ধাক্কায় তালগোল পাকিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়েন তিনি।
নাসিমা খান তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, গাত্রদাহের চেয়ে মনদাহ তখন আমার প্রবল। কাউকে কিছু না জানিয়ে এমনভাবে ফেলে দেওয়ায় রাগে ও অভিমানে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন এবং যিনি ধাক্কা দিয়েছিলেন তাঁকেও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করার কথা ভেবেছিলেন।
তৈরি করা হাসির চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে 'কার বউ' অন্যতম। ছবিতে নাসিমা খানের বিপরীতে হারুন, গোলাম মুস্তাফা ও সুভাষ দত্তের মতো অভিনেতারা অভিনয় করেছিলেন। সে সময় বর্তমানের মতো বডি ডাবল বা ডামি ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় শিল্পীদের নিজেদেরই বিপজ্জনক ও কঠিন দৃশ্যে অংশ নিতে হতো। শুধু 'কার বউ' নয়, ১৯৬২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'সূর্যস্নান' ছবির শুটিংয়ের সময়ও আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একটি আবেগময় দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে ১২ থেকে ১৪ বার শট দিতে হয়েছিল তাঁকে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তিনি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের শীর্ষস্থানীয় নায়িকাদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নেওয়া নাসিমা খান ১৯৫৯ সালে 'জাগো হুয়া সাভেরা' ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন। 'তানহা', 'যে নদী মরু পথে', 'ধারাপাত', 'উজালা'সহ বহু সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় লাহোরের প্রতিষ্ঠিত অভিনয়জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। জীবনের শেষ অধ্যায়ে ব্যক্তিগত নানা ট্র্যাজেডি ও অসুস্থতার মধ্য দিয়ে গেলেও তাঁর অভিনয় জীবনের অবদান দেশের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ চিরদিন স্মরণ রাখবে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।