
প্রচলিত ধারার বাণিজ্যিক নায়কদের ভিড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের অভিনয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিলেন গুণী অভিনেতা নানা পাটেকর। আশির ও নব্বইয়ের দশকে যখন হিরোইক কাণ্ডকারখানা আর অ্যাংরি ইয়াং ম্যানের ধারণায় মগ্ন ছিল বলিউড, সেই সময়ে ন্যাচারালিস্টিক ঘরানার অভিনয়ে নতুন দৃশ্যরূপ নিয়ে হাজির হন তিনি। রূপালি পর্দার চেনা নায়কের বদলে চরিত্রকে প্রধান করে তুলে সাধারণ জিন্স ও সাদা শার্টেই বাজিমাত করেছিলেন এই অভিনেতা। অংকুশ কিংবা পরিন্দা সিনেমার মাধ্যমে নিজের চরিত্রকে এক স্নায়বিক তীব্রতা দিয়েছিলেন নানা পাটেকর, যা দর্শককে একাধারে ভয় ও বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতো।
মারাঠি থিয়েটার ও আঞ্চলিক সিনেমা থেকে বলিউডে পোক্ত অবস্থান তৈরি করতে করতে নানা পাটেকর হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার চেঁচামেচির বদলে নিয়ন্ত্রিত ও টানটান শরীরী অভিনয়ের পত্তন করেন। শান্ত কণ্ঠে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে করতে গম্ভীর সংলাপ বলার নিজস্ব স্টাইল তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ডার্ক হিউমারকে অভিনয়ের অন্যতম শক্তি বানিয়ে তিনি কখনো গ্যাংস্টার, কখনো শিক্ষক, লেখক, আবার কখনো বাক-প্রতিবন্ধী বাবার চরিত্রে অনন্য অভিনয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। মাধুরী দীর্ষিতের সিনেমার দর্শকও হল থেকে বেরিয়ে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা সেই ব্যাটামানুষ নানা পাটেকরের অভিনয়ে বিমোহিত হয়ে থাকতেন।
চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করা এই অভিনেতা গৌতম ঘোষের যাত্রা চলচ্চিত্রে নামমাত্র সম্মানী নিয়ে লেখকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। আবার অমল পালেকরের থোড়াসা রোমানি হো যায়েঁ সিনেমায় বারিশওয়ালা চরিত্রের জন্য এক সপ্তাহ রিহার্সাল করে জাদুকরী পারফরম্যান্স উপহার দেন। চরিত্রের টানে নিজের জমি বিক্রি করে পরিচালককে সিনেমা শেষ করার টাকা জুগিয়ে দেওয়ার মতো বিরল ঘটনাও ঘটেছে তার জীবনে। তার অভিনীত খলনায়ক বা জটিল চরিত্রগুলো মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মানবিক জটিলতাকে ফুটিয়ে তুলতো, যা অপরাধকে উৎসাহিত না করে দর্শককে সমাজের গভীর বাস্তবতার মুখোমুখি করত।
চলচ্চিত্রের বাইরেও নানা পাটেকরের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর। নিজের পরিচালিত সিনেমায় একটি চরিত্রে নিখুঁত অভিনয় করতে তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ তিন বছর প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীতে ভারতের ইতিহাসের বিখ্যাত কারগিল যুদ্ধে মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে মেজর হিসেবে লড়াই করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদা নিয়ে অবসরে যান। একটি সিনেমার চরিত্র রূপায়ণের জন্য এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের ঘটনা বিশ্ব সিনেমা ইতিহাসে বিরল। পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে যৌন হেনস্থার অভিযোগ ও নানা আইনি ঝামেলার মুখোমুখি হলেও তিনি বিলাসবহুল জীবন বর্জন করে গ্রামের সাধারণ চাষিদের জীবন বেছে নেন। নিজের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন রেখে বাকি সব সম্পদ তিনি কৃষকদের কল্যাণে বিলিয়ে দেন।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের এই যুগে যখন নৃশংসতাকে আরও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক করে তোলার প্রবণতা দেখা যায়, তখন নানা পাটেকরের সংযমী ও গভীর অভিনয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভূত হয়। অর্ধযুগেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকমন জয় করেছেন। সাধারণ থেকে অসাধারণ এবং অসাধারণ থেকে একেবারে সাধারণ হয়ে ওঠার এই মানুষটির জীবন ও কর্ম ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।