
চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপের মুখে ব্যাংককের কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে শুরু হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এই সম্মেলন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের কাছ থেকে নতুন ঋণ সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে একে একটি নির্ধারক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সংস্থাটির নির্ধারিত সংস্কার এজেন্ডা ও কঠিন শর্ত বাস্তবায়নের পরিবর্তে নিজস্ব বিকল্প অর্থায়ন ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পথে হাঁটতে চাইছে সরকার।
১৯১টি দেশের প্রায় ১৫ হাজার প্রতিনিধির অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে যুদ্ধ, হঠাৎ তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত সুদহার এবং ঋণের বোঝা মূল এজেন্ডা হিসেবে স্থান পেয়েছে। থাই সংবাদমাধ্যম এই সম্মেলনকে অর্থনীতি বিশ্বের 'ফাইন্যান্স অলিম্পিক' হিসেবে অভিহিত করেছে। সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আইএমএফ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংস, জেপি মরগ্যান এবং চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিচ্ছে। দেশের কোটা অনুযায়ী বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
সম্মেলন শুরুর আগেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বিদ্যমান আর্থিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ১৮২ কোটি ডলার, সারে প্রায় ৭ কোটি ডলার এবং জ্বালানি তেলে ২২১ কোটি ডলার খরচের প্রয়োজন পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিজেদের কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, তার দায়ভার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই নিতে হবে।
দেশের পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজস্ব কৌশল ও দেশীয় বাস্তবতার আলোকে অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাতের আস্থা ফেরানো, বন্ধ কলকারখানা সচল করা এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির নতুন এই সমীকরণ বাস্তবায়নে কাজ করছে বর্তমান সরকার। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি জোরদার করেছে এবং নীতি সুদহার দশ শতাংশের ওপরে উন্নীত করেছে। তবে ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের অভাব দূর না হলে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি আসা কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালু করা হলেও নিট রিজার্ভের স্থিতি এখনো চাপের মুখে রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সরকারি ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার নির্দেশনা থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এর ধাক্কা সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহযোগিতায় সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো ও সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পূর্বের কর্মসূচি থেকে বের হয়ে নতুন মেয়াদের একটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কাঠামো অর্জনের চেষ্টা করছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।