
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদান করে আসা গাইবান্ধার লুৎফুর রহমান পেলেন মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে তাকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে লুৎফুর রহমানের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও লুৎফুর রহমান নিজ উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের পড়িয়ে আসছেন। অর্থের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার তার এই নিরলস প্রচেষ্টা সময়ের সঙ্গে গাইবান্ধায় তাকে এক টাকার শিক্ষক হিসেবে পরিচিত করে তোলে। তার হাত ধরে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থী আলোর মুখ দেখেছে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বল্প খরচে শিক্ষা বিতরণের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি দেশজুড়ে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে লুৎফুর রহমান ছাড়াও আরও কয়েকজন শিক্ষাব্রতীকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রমনী কান্ত পাঠশালার রমনী কান্ত বেপারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় অবদান রাখা প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশনের সহকারী শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন খান উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, মাদরাসা, কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা মোট ১০২ জন শিক্ষককে এবার এই জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শিক্ষা অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পৃথক বিচারক ও সার্চ কমিটির কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই গুণী শিক্ষকদের নির্বাচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। বক্তারা বলেন, লুৎফুর রহমানের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরাই সমাজের প্রকৃত মেরুদণ্ড এবং তাদের এই আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাসেবা দেশের সামগ্রিক সাক্ষরতা আন্দোলনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। লুৎফুর রহমানের এই সম্মাননা প্রাপ্তি কেবল একজন ব্যক্তির স্বীকৃতি নয়, বরং দেশের অবহেলিত জনপদে শিক্ষা বিস্তারে নিয়োজিত সকল স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকের মর্যাদাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের এই ধরনের স্বীকৃতি ভবিষ্যতেও তৃণমূল স্তরে এমন মহৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের আরও বেশি উৎসাহিত করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।