
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর তার অনন্য উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। সম্প্রতি এই হাওরের জীববৈচিত্র্যের মাঝে সন্ধান মিলেছে দুই দুর্লভ উদ্ভিদ দুধিয়া লতা এবং গোলাপি বিষকাঁটালি ফুলের, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও গবেষকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। সুদূর অতীত থেকে হাওর অঞ্চলের বন্যপ্রকৃতিতে টিকে থাকা এই উদ্ভিদগুলো কেবল তাদের রূপের জন্যই নয়, বরং পরিবেশগত গুরুত্বের কারণেও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রকৃতিতে এই উদ্ভিদগুলোর উপস্থিতি নতুন কিছু নয়, তবে যত্রতত্র এদের দেখা মেলে না। অতীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাভূমি বা আধা শুষ্ক এলাকায় এগুলোর উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে আবাসস্থল ধ্বংস ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এগুলো অনেকটাই বিরল হয়ে পড়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস আরণ্যকে দুধিয়া ফুলের উল্লেখ থাকলেও হাওরের এই দুধিয়া লতা এবং বুনো ফুলের বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন। হাওরের কান্দায় ঘুরে বেড়ানোর সময় এই অনন্য উদ্ভিদগুলোর রূপ বৈচিত্র্য স্থানীয় পরিবেশের স্বকীয়তা ফুটিয়ে তোলে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের বিপুল উদ্ভিদবৈচিত্র্যের মধ্যে দুধিয়া লতা ও গোলাপি বিষকাঁটালি প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এই বুনো ফুলগুলো আজ বিলুপ্তির পথে।
দুধিয়া গাছ বা অক্সিস্টেলমা সেকামোন হলো একটি লতানো, নরম, রোমশ ও বহুবর্ষজীবী বৃক্ষারোহী উদ্ভিদ। এর সাদা জমিনে বেগুনি ও গোলাপি রঙের শিরাযুক্ত ফুলগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বর্ষার শেষভাগে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং শীতের শুরুতে ফল ধরে। অন্যদিকে, গোলাপি বিষকাঁটালি বা স্টিকি নটউইড হলো একটি বর্ষজীবী ও কটু গন্ধযুক্ত ভেষজ উদ্ভিদ। হিমালয় অঞ্চল থেকে শুরু করে চীন ও জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে এর দেখা মেলে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই গাছে গোলাপি আভাযুক্ত ফুল ফোটে।
ঐতিহ্যগতভাবে বিষকাঁটালি নানা ভেষজগুণে সমৃদ্ধ একটি উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এই গাছের পাতার রস মানুষের রক্তপাত বন্ধ করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এছাড়া রক্তবমি, রক্ত আমাশয় নিরাময় এবং ফোড়া ফাটানোর কাজেও এই উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গ্রামীণ জনপদে ঔষধি গাছ হিসেবে এর কদর দীর্ঘদিনের।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে জলাভূমি অঞ্চলের বিরল উদ্ভিদগুলো আজ হুমকির মুখে। টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমে এই ধরনের উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বুনো ফুল ও লতাগুল্ম সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদগুলো চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। তাই হাওরের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় গবেষণার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।