
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতียার্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর কলকাতার বহুজাতিক নগরীতে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হিন্দুস্তানি ভাষার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। বিচারকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য হিন্দুস্তানি শিক্ষা জরুরি হয়ে পড়ায় ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজের হিন্দুস্তানি ভাষা বিভাগের প্রধান জন গিলক্রিস্ট অভিন্ন হিন্দুস্তানি ভাষাকে ফারসি লিপিতে উর্দু এবং দেবনাগরি লিপিতে হিন্দিতে রূপান্তর করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভাষানীতির ভিত্তি স্থাপন করেন। ভাষাবিদ সঞ্জয় কুমারের মতে, এই লিপিকেন্দ্রিক বিভাজন দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে যুক্ত করে যা পরবর্তীতে ভারত বিভাজনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের শাসন দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দি ও উর্দুকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ উসকে দেয়। ১৯২০ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস দেবনাগরি হিন্দিতিকে জাতীয় ভাষা ঘোষণা করলে, ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগের লখনৌ সম্মেলনে ফারসি লিপিযুক্ত উর্দুর স্বীকৃতি দাবি করা হয়। এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণের ফলস্বরূপ ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে হিন্দি ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করে।
স্বাধীনতার পর ভারত ও পাকিস্তানে ভাষাভিত্তিক রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। ভারতে হিন্দির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলা, তামিলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবিকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে বাঙালি শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলে।
বাঙালি তরুণ সমাজের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে ১৯৫৪ সালে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। তবে পশ্চিম পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকশ্রেণি বাঙালিদের প্রতি ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখে যা মূলত ব্রিটিশ শাসকদের মানসিকতারই ধারাবাহিকতা ছিল। পূর্ব বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর এই আঘাত শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে শুরু করে উপমহাদেশে ভাষা ও ধর্মের রাজনীতির যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দৃশ্যমান। ঔপনিবেশিক বিভেদমূলক নীতির উত্তরাধিকার বয়ে চলা এই রাষ্ট্রগুলোতে ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার লড়াই এখনো বিভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।