
ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠার নামে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় যে নৃশংস গণহত্যা, লুণ্ঠন ও দাস ব্যবসা চালানো হয়েছিল, তার ঐতিহাসিক দলিলাস্ত্রে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ মানবতাবিরোধী চিত্র। স্পেনের ইনকা সাম্রাজ্য গ্রাস থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির বর্বরোচিত আচরণ প্রমাণ করে যে, সভ্যতার বিস্তারের আড়ালে মূলত রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া এই উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় আদিবাসীদের ওপর চালানো হয় অকথ্য নিপীড়ন, যার দীর্ঘমেয়াদী কুফল আজও ভোগ করছে বিশ্ববাসী।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৫৩২ সালে ফ্রান্সিসকো পিজারোর নেতৃত্বে স্প্যানিশ বাহিনী ইনকা সম্রাট আতাহুয়াল্পাকে বন্দি করে পুরো নগরজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়। মুক্তিপণের নামে বর্তমান বাজারমূল্যে অর্ধ-বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের স্বর্ণ ও রৌপ্য আদায় করার পর প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে সম্রাটকে হত্যা করা হয়। অনুরূপভাবে, ১৬০৭ সালে ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া কোম্পানি উত্তর আমেরিকার জেমসটাউনে বসতি স্থাপন করতে গিয়ে পাওহাটান জনগোষ্ঠীর ওপর পৈশাচিক হামলা চালায়। তুচ্ছ কারণে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া এবং নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যার নজির স্থাপন করে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো।
“যে সব জনগোষ্ঠী আমাদের কথা শোনে না, আমাদের আরোপিত শর্ত মানতে অনীহা প্রকাশ করে, তাদের সর্বস্ব লুট করে অবশ্যই তাদের সর্বস্বান্ত করতে হবে। বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে বিপর্যস্ত করে দিতে হবে।” - কর্নেল মন্তানিয়াক, ফরাসি সামরিক কর্মকর্তা (১৮৪৬)
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জোরপূর্বক আদিবাসীদের জমি দখল এবং ধর্মান্তকরণের জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মকে ব্যবহার করেছিল। ১৪৯৩ সালে রোমীয় ক্যাথলিক গির্জার পোপ দুটি আনুষ্ঠানিক ফতোয়ার মাধ্যমে স্পেন ও পর্তুগালকে নতুন নতুন অঞ্চলে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচার এবং পৌত্তলিকদের ধর্মান্তকরণের জন্য উপনিবেশায়নের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রদান করেন। পোপ-প্রদত্ত এই ধর্মীয় অনুমোদনের পাশাপাশি বাইবেলের বিভিন্ন পংক্তির মনগড়া অপব্যাখ্যা দিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের সমস্ত অমানবিক ও আগ্রাসী কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
আরও পড়ুন: মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ফাঁদে পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
পরিশেষে বলা যায়, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এসব নির্মাণবিক ব্যবস্থা অবলম্বনের মধ্য দিয়ে মূলত তাদের নিজস্ব অন্তর্নিহিত আগ্রাসী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এশিয়া ও আমেরিকার মাটিতে পিজারো কিংবা আলজেরিয়ায় মন্তানিয়াকদের মতো সামরিক কর্মকর্তাদের চালিত গণহত্যা ও লুণ্ঠনের ইতিহাস কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির কাঠামোগত বৈষম্য ও সংকটের মূল শেকড়। এই ঐতিহাসিক অপরাধের ক্ষত ও তার বহুমুখী কুফল আজও খোদ ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীসহ উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোর মানুষকে নানাভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।