
নিরামিষ দিনে বা মাছ মাংস ছাড়া নতুন কিছু খেতে ইচ্ছে করলে কাঁচা কলার কোফতা হতে পারে দারুণ পছন্দ। কাঁচা কলার নরম গা আর মশলার মিশ্রণে তৈরি এই কোফতা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি মুখরোচক। ভাত কিংবা রুটি, দুটোর সঙ্গেই এই পদ মানিয়ে যায় চমৎকারভাবে।
বাঙালি হিন্দু পরিবারে নিরামিষ দিনের রেওয়াজ অনেক পুরনো। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বা পূজা পার্বণে অনেকেই মাছ মাংস ছাড়া রান্না করেন। সেই দিনগুলোতে একঘেয়ে ডাল সবজির বদলে যদি টেবিলে থাকে কাঁচা কলার কোফতা, তাহলে খাবারের আনন্দ বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
কাঁচা কলা বাজারে সারা বছরই পাওয়া যায়, দামও সাধ্যের মধ্যে। ফলে এই রেসিপি যেকোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের টেবিলে আনতে পারে নতুনত্বের ছোঁয়া।
কাঁচা কলার কোফতা বানানোর সময় মণ্ডটা খুব নরম হয়ে গেলে কোফতা ভাজার সময় ভেঙে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একটু বেসন বা চালের গুঁড়া মিশিয়ে নিলে সমস্যা মিটে যায়। কোফতা ভাজার সময় তেল মাঝারি গরম রাখুন, বেশি আঁচে বাইরে পুড়ে ভেতর কাঁচা থাকবে। ঝোলে কোফতা দেওয়ার পর বেশি নাড়াচাড়া না করাই ভালো, নইলে কোফতা ভেঙে যেতে পারে।
## কাঁচা কলা বাছাই ও প্রস্তুতি
কোফতার জন্য মাঝারি পাকা কাঁচা কলা বেছে নিন। একেবারে কচি কলায় কষ বেশি থাকে, আর বেশি পাকা কলায় মিষ্টি স্বাদ চলে আসে যা কোফতার জন্য ঠিক নয়। কলার খোসার রং হবে সবুজ, গায়ে কালো দাগ থাকলে সেটা বাদ দিন। কলা কিনে এনে খোসা ছাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবিয়ে রাখুন, নইলে কালো হয়ে যাবে।
কাঁচা কলা সেদ্ধ করার সময় খোসাসহ সেদ্ধ করলে ভেতরের অংশ নরম হয় সমানভাবে। প্রেসার কুকারে দুই তিনটি সিটি দিলেই যথেষ্ট। সেদ্ধ হয়ে গেলে ঠান্ডা করে খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে চটকে নিন। চটকানোর সময় কোনো দলা থাকলে চলবে না, মসৃণ মণ্ড হলেই কোফতা হবে নরম। আলুও একইভাবে সেদ্ধ করে চটকে মেশান, আলু দিলে কোফতা হয় আরও নরম ও সুস্বাদু।
## কোফতা না ভাঙার কায়দা
কোফতা ভাজার সময় ভেঙে যাওয়া এই রেসিপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সমাধান লুকিয়ে আছে মণ্ডের সঠিক মিশ্রণে। মণ্ড যদি বেশি নরম হয়, তাহলে দুই টেবিল চামচ বেসন বা চালের গুঁড়া মিশিয়ে নিন। বেসন কোফতাকে বাঁধতে সাহায্য করে। মণ্ড হাতে নিয়ে বল বানিয়ে দেখুন, যদি আকৃতি ধরে রাখে তাহলে ঠিক আছে।
কোফতা গড়ার আগে হাতে একটু তেল মেখে নিন, এতে মণ্ড হাতে লাগবে না। কোফতার আকার মাঝারি রাখুন, বেশি বড় করলে ভেতর কাঁচা থাকবে। ভাজার সময় তেল মাঝারি গরম রাখুন। তেল ঠান্ডা থাকলে কোফতা তেল টেনে নেবে আর ভেঙে যাবে। কোফতা তেলে ছাড়ার পর এক মিনিট নাড়াচাড়া করবেন না, গা শক্ত হতে দিন। তারপর হালকা করে উল্টে দিন।
## ঝোলের সঠিক ঘনত্ব
কোফতার ঝোল হবে মাঝারি ঘন। বেশি পাতলা হলে কোফতা ডুবে থাকবে না, আর বেশি ঘন হলে মশলার স্বাদ কড়া লাগবে। মশলা কষানোর পর এক কাপ গরম পানি দিন। ঠান্ডা পানি দিলে মশলার স্বাদ বসে না। ঝোল ফুটে উঠলে কোফতাগুলো একটা একটা করে ছাড়ুন। তারপর ঢেকে মাঝারি আঁচে ৫ থেকে ৭ মিনিট রান্না করুন। এই সময়ে কোফতা ঝোল টেনে নরম হবে।
## উপকরণ
কাঁচা কলা ৪টি, আলু ২টি, ছোলার ডাল বাটা ২ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, কাঁচামরিচ কুচি ২টি, আদা কুচি ১ চা চামচ, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়া আধা চা চামচ, জিরা গুঁড়া আধা চা চামচ, গরম মসলা গুঁড়া সামান্য, বেসন ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, ভাজার জন্য তেল।
ঝোলের জন্য: পেঁয়াজ বাটা আধা কাপ, টমেটো বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, হলুদ, মরিচ ও ধনে গুঁড়া পরিমাণমতো, তেল ৩ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো।
## প্রণালী
১. কাঁচা কলার খোসা ছাড়িয়ে ও আলু সেদ্ধ করে ভালোভাবে চটকে নিন।
২. চটকানো মিশ্রণে ছোলার ডাল বাটা, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচামরিচ, আদা, ধনেপাতা, সব গুঁড়া মসলা, বেসন ও লবণ মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করুন।
৩. হাতে তেল মেখে মণ্ড থেকে ছোট ছোট বল বা ডিম্বাকৃতি কোফতা গড়ে নিন।
৪. গরম তেলে কোফতাগুলো মাঝারি আঁচে সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন।
৫. আলাদা কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ বাটা ভেজে আদা রসুন বাটা ও গুঁড়া মসলা দিয়ে কষান।
৬. টমেটো বাটা দিয়ে আরও কষিয়ে ১ কাপ গরম পানি দিন। ঝোল ফুটে উঠলে কোফতা ছেড়ে দিন।
৭. ঢেকে ৫-৭ মিনিট রান্না করে গরম মসলা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
## সাধারণ ভুল ও সমাধান
কোফতা ভেঙে গেলে বুঝবেন মণ্ডে বাঁধন কম ছিল। বেসন বা চালের গুঁড়া মিশিয়ে নিন। কোফতার ভেতর কাঁচা থাকলে আকার ছোট করুন আর আঁচ কমিয়ে ভাজুন। ঝোলে কোফতা দেওয়ার পর যদি ঝোল বেশি পাতলা মনে হয়, তাহলে ঢাকনা খুলে কিছুক্ষণ জ্বাল দিন। আর ঝোল বেশি ঘন হলে একটু গরম পানি মিশিয়ে নিন। লবণ কম হলে কোফতার ভেতর স্বাদ ঢোকে না, তাই মণ্ডে লবণ ঠিকমতো দিন। ভাজা কোফতা একবারে বেশি করে না ভেজে অল্প অল্প করে ভাজুন, এতে তেলের তাপমাত্রা ঠিক থাকে।
## পরিবেশন ও সংরক্ষণ
নরম কোফতা আর ঝোলের এই মেলবন্ধন নিরামিষ দিনেও ভাতের প্লেট করবে পূর্ণ। গরম ভাতের সঙ্গে কোফতার ঝোল মেখে খাওয়ার মজাই আলাদা। রুটি বা পরোটার সঙ্গেও এই পদ দারুণ লাগে। অতিথিদেরও চমকে দিতে পারেন এই ভিন্ন স্বাদের পদ দিয়ে। উপরে ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন, দেখতে সুন্দর লাগবে।
ভাজা কোফতা আলাদা করে ফ্রিজে রেখে দুই তিন দিন খাওয়া যায়। ঝোলে দেওয়ার আগে গরম করে নিন। তবে ঝোলসহ কোফতা ফ্রিজে রাখলে কোফতা নরম হয়ে ভেঙে যেতে পারে, তাই আলাদা রাখাই ভালো। খাওয়ার আগে কোফতা গরম ঝোলে দিয়ে দুই মিনিট ফুটিয়ে নিন।
## একটু ভিন্ন স্বাদ চাইলে
কাঁচা কলার বদলে কাঁচা পেঁপে দিয়েও কোফতা বানানো যায়, স্বাদ হয় একটু ভিন্ন কিন্তু দারুণ। ছোলার ডালের বদলে মসুর ডাল বাটা দিলেও চলে। যারা পেঁয়াজ খান না, তারা পেঁয়াজ বাদ দিয়ে হিং ও আদা বেশি দিয়ে রান্না করতে পারেন। ঝোলে একটু নারকেল দুধ মেশালে আসে মিষ্টি স্বাদের ছোঁয়া।
এই কোফতা একবার বানিয়ে দেখুন, নিরামিষ দিনের মেন্যুতে এটাই হয়ে উঠবে সবার প্রিয় পদ।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।