
ফোন হারিয়ে যাওয়া মানেই শুধু একটি ডিভাইস হারানো নয়, সঙ্গে হারায় ব্যক্তিগত ছবি, বার্তা, ব্যাংকিং তথ্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনা যায়। আগে থেকে প্রস্তুতি থাকলে কাজটা আরও সহজ হয়।
প্রথমে অন্য কোনো ফোন বা কম্পিউটার থেকে গুগলের "ফাইন্ড মাই ডিভাইস" সেবায় লগইন করুন। সেখানে ফোনের শেষ অবস্থান মানচিত্রে দেখা যায়। ফোন কাছাকাছি কোথাও থাকলে দূর থেকে রিং বাজানো যায়, এমনকি সাইলেন্ট মোডেও পূর্ণ শব্দে বাজবে। এই সুবিধা কাজ করার জন্য ফোনে আগে থেকে লোকেশন চালু ও গুগল অ্যাকাউন্টে লগইন থাকা দরকার।
ফোন ফিরে পাওয়ার আশা থাকলে দূর থেকে ডিভাইসটি লক করে দিন এবং স্ক্রিনে একটি বার্তা দেখানোর ব্যবস্থা করুন। সেখানে আপনার বিকল্প নম্বর লিখে দিন, যাতে সৎ কেউ ফোন পেলে যোগাযোগ করতে পারে। লক করা থাকলে অন্য কেউ ফোনের ভেতরের তথ্য দেখতে পারবে না।
ফোন ফিরে পাওয়ার আশা না থাকলে দূর থেকে ফোনের সব তথ্য মুছে দেওয়ার অপশনও আছে। তবে মনে রাখবেন, একবার মুছে দিলে পরে আর ফোনের অবস্থান জানা যাবে না। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিশ্চিত হোন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ থাকলে মুছে দিতে দ্বিধা কম হয়।
আইফোন ব্যবহারকারীরা একই কাজ করতে পারবেন অ্যাপলের "ফাইন্ড মাই" সেবা দিয়ে। আইক্লাউড ওয়েবসাইটে লগইন করে ডিভাইসের অবস্থান দেখা, শব্দ বাজানো, লস্ট মোড চালু করা বা দূর থেকে তথ্য মোছা যায়। লস্ট মোডে ফোন লক হয়ে যায় এবং স্ক্রিনে আপনার বার্তা দেখা যায়।
এরপর দ্রুত মোবাইল অপারেটরের হেল্পলাইনে ফোন করে সিম বন্ধ করে দিন। সিম চালু থাকলে অন্য কেউ আপনার নম্বরে আসা ওটিপি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারে। হেল্পলাইনের নম্বর সাধারণত অপারেটরের ওয়েবসাইটে বা সিমের প্যাকেটে লেখা থাকে। সিম বন্ধ করার সময় আপনার পরিচয় যাচাই করতে কিছু তথ্য চাওয়া হতে পারে।
বিকাশ, নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থাকলে সেগুলোর হেল্পলাইনে জানিয়ে লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখুন। পিন নম্বর কেউ জেনে গেলেও অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকলে টাকা তোলা যাবে না। পরে নতুন সিম তুলে আবার চালু করা যায়।
ফোনে ব্যাংকের অ্যাপ বা ইমেইল লগইন করা থাকলে অন্য ডিভাইস থেকে পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন। গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদলালে হারানো ফোন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডও বদলে নিন। অনেক সেবায় সব ডিভাইস থেকে একসঙ্গে লগআউট করার অপশন আছে।
থানায় জিডি করতে ভুলবেন না। ফোন হারানোর সাধারণ ডায়েরি করতে ফোনের আইএমইআই নম্বর, মডেল ও হারানোর স্থান-সময় জানাতে হয়। আইএমইআই নম্বর ফোনের বাক্সে বা কেনার রসিদে লেখা থাকে। জিডির কপি সংরক্ষণ করে রাখুন, ফোন উদ্ধারে বা বীমার কাজে এটি লাগতে পারে।
ফোন হারানোর পর অনেকেই প্রতারকের ফাঁদে পড়েন। অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়েছি বলে কেউ টাকা চাইলে সাবধান হোন। আসল উদ্ধার প্রক্রিয়ায় কেউ আগাম টাকা চায় না। পুলিশের নাম করে টাকা চাইলেও যাচাই না করে দেবেন না। সন্দেহজনক কল এলে থানায় জানান।
আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে ক্ষতি অনেক কম হয়। ফোনে সবসময় স্ক্রিন লক ব্যবহার করুন, যাতে অন্য কেউ সহজে ঢুকতে না পারে। আঙুলের ছাপ বা মুখের স্বীকৃতি চালু রাখলে নিরাপত্তা আরও বাড়ে। গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথির ব্যাকআপ নিয়মিত ক্লাউডে রাখুন। ফোনের বাক্সে থাকা আইএমইআই নম্বরটি কোথাও লিখে রাখুন, জিডি করতে গেলে এটি কাজে লাগে।
ফাইন্ড মাই ডিভাইস বা ফাইন্ড মাই সেবা আগে থেকেই চালু আছে কিনা, আজই একবার দেখে নিন। অনেক ফোনে এটি নিজে থেকে চালু থাকে, তবে নিশ্চিত হওয়া ভালো। পরিবারের সদস্যদের ফোনেও এই সেটিংস দেখে দিন। সতর্কতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। আজই ফোনের নিরাপত্তা সেটিংসগুলো একবার দেখে নিন, পরে আফসোস করতে হবে না।
হারানো ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ চালু থাকলে নতুন সিমে একই নম্বর চালু করে আবার যাচাই করুন। এতে পুরনো ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। অন্য মেসেজিং অ্যাপেও নতুন ডিভাইস থেকে লগইন করে পুরনো সেশন বন্ধ করে দিন। এতে আপনার বার্তা অন্যের হাতে পড়ার ঝুঁকি কমে।
ফোনে ব্যাংকের কার্ডের তথ্য সংরক্ষিত থাকলে ব্যাংককে জানান। প্রয়োজনে কার্ড সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বলুন। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের পাসওয়ার্ডও বদলে ফেলুন। সতর্কতামূলক এই পদক্ষেপে আর্থিক ক্ষতি এড়ানো যায়। পরে সব ঠিক হলে আবার চালু করা যায়।
নতুন ফোন কেনার পর পুরনো ব্যাকআপ থেকে তথ্য ফিরিয়ে আনুন। গুগল বা আইক্লাউডের ব্যাকআপ থাকলে নতুন ফোনে সহজে সব ফিরে পাবেন। নতুন ফোনেই ফাইন্ড মাই ডিভাইস চালু করে নিন, যাতে ভবিষ্যতে আবার এমন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
জিডির কপি ও অপারেটরের কাগজপত্র একসঙ্গে নিরাপদে রাখুন। নতুন সিম তোলার সময় এই কাগজ লাগতে পারে। একই নম্বর ফিরে পেলে পরিচিতজনদের জানিয়ে দিন, যাতে তারা বিভ্রান্ত না হন। ধাপে ধাপে এগোলে পুরো প্রক্রিয়া সহজ হয়।
পরিবারের সবার ফোনে এই প্রস্তুতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ুন। বাবা-মায়ের ফোনে স্ক্রিন লক ও ফাইন্ড মাই ডিভাইস চালু করে দিন। বিপদের সময় এই ছোট প্রস্তুতিই বড় কাজে আসে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।