
বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং ১৩ শতাংশের বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছরের আগে, যা শিশু অধিকার ও মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথ জরিপে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের অগ্রগতির পথে এক বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চরাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় নদীভাঙন, পারিবারিক দারিদ্র্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব কিশোরীদের বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে ফেলছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব এবং চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে বাল্যবিবাহের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। কোনো ধরনের শিক্ষা না পাওয়া নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।
বাল্যবিবাহ শুধু একটি ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা নয়, এটি শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং একধরনের যৌন নির্যাতন। একটি শিশুকে বিয়ের নামে এমন একটি সম্পর্কে ঠেলে দেওয়া হয়, যার জন্য সে শারীরিক বা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না।
বিয়ের পর অধিকাংশ কিশোরীর পড়াশোনার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা গারহস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়। এছাড়া ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে অল্প বয়সে সন্তান জন্মদানের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সমাজের গভীর প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এই অপরাধকে টিকিয়ে রাখছে।
পরিবার ও সমাজের একটি বড় অংশ এখনো মনে করে যে মেয়েদের বড় করা ও বিয়ে দেওয়াটাই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মানহানির ভয়ে বা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মা-বাবা কিশোরী মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে গণমাধ্যম, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সরকারের মূল দায়িত্ব হলো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং জন্ম ও বিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া জোরদার করা। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া এলাকার মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ বিনিয়োগ এবং সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে, যাতে প্রতিটি কিশোরী তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।