
চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৫ হাজার ৬১৪ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়ে সিঙ্গাপুর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক শ্রমবাজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, প্রথাগত বেশ কয়েকটি গন্তব্যে কর্মী নিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার ফলে এই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও দেশটির কঠোর অভিবাসন নীতি ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে এই ধারা বজায় রাখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মীর যাওয়ার হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে ৬৪ হাজার ৩৮৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৫৩ হাজার ২৬৫ জন কর্মী সেখানে কাজের জন্য যান। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ৫৬ হাজার ৮৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৭০ হাজার ৮৩২ জনে দাঁড়ায়। ওমান, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক কর্মসংস্থানের গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১.৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৩ আগস্ট ন্যাশনাল ডে র্যালিতে তিনি জানান যে, আগামী বছরগুলোতে শ্রমশক্তিসহ মোট জনসংখ্যা ধীরগতিতে বৃদ্ধি পাবে এবং সরকার নিশ্চিত করবে যেন সিঙ্গাপুরবাসীরা নিজ দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার এ বিষয়ে বলেন, সিঙ্গাপুর বিদেশি কর্মী নিয়োগে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে স্বল্প ও অর্ধদক্ষ কর্মীর চাহিদা কমে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়তে পারে।
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী অভিবাসন ব্যয়। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মীরা জানিয়েছেন যে চাকরি নিশ্চিত করতে তাদের ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, সিঙ্গাপুরের ছয়টি কোম্পানি রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ার একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলি ধরে রেখে অস্বাভাবিক অর্থ আদায় করছে। প্রকৃত খরচ ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও তা তিনগুণের বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকার ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে ডেকে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের নির্মাণ খাত এখনো বিদেশি শ্রমিকদের চাহিদা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির নির্মাণ খাত বছরওয়ারি ১১.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৬.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার কারণে অভিবাসী শ্রমিকদের চাহিদা বজায় থাকলেও, দেশটি এখন আরও নিয়ন্ত্রিত ও দক্ষতাভিত্তিক নীতির দিকে এগোচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের জনশক্তি খাতকে দক্ষ কর্মী তৈরি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি নিতে হবে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।