জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর: গণভবনে আন্দোলন দমনের শেষ চেষ্টা ও শেখ হাসিনার পতন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমাতে চরম কঠোর অবস্থান নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে দেশের ইতিহাসের অন্যতম এই জনজোয়ারের মুখে ধসে পড়ে সাড়ে ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে সেই উত্তাল দিনগুলোর অজানা বহু তথ্য।
গণভবনে আন্দোলন দমনের শেষ ছক:
রাজসাক্ষ্য দেওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, আন্দোলন দমনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসভবনে নিয়মিত 'কোর কমিটি'র বৈঠক হতো। পরবর্তীতে ৪ আগস্ট বেলা ১১টায় গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেশ করা হলেও রাত ৯টায় আবারও জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। ওই নৈশ বৈঠকে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ব্যর্থ করে দিতে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের সমন্বয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাতেই সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে ঢাকা শহরের প্রবেশপথগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
সমন্বয়কদের কৌশল পরিবর্তন ও সরকার পতনের এক দফা:
অন্যদিকে সরকার যখন আন্দোলন নস্যাতের পরিকল্পনা করছিল, তখন আন্দোলনকারীরাও নিজেদের কৌশল বদলে ফেলেন। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তৎকালীন সমন্বয়ক (বর্তমানে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) নাহিদ ইসলাম জানান, ৩ আগস্ট শহীদ মিনার থেকে এক দফা ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ হওয়ার কথা থাকলেও, নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে সমন্বয়কদের ওপর হামলা বা গুম করার আশঙ্কা থেকে কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। মাহফুজ আলমের সমন্বয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের সাথে আলোচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
পতন ও ট্রাইব্যুনালের রায়:
৫ আগস্ট সকালে রাজপথে জনস্রোত নেমে এলে এবং ঢাকার প্রবেশপথগুলো ছাত্র-জনতার দখলে চলে গেলে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পদত্যাগের পর বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে হেলিকপ্টারে ভারতে পাড়ি জমান তিনি। পরবর্তীতে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
মন্তব্য করুন