বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি বড় সুখবর এসেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন অর্থবছর থেকে তাদের বেতন বাড়তে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী স্বয়ং বাজেট বক্তৃতায় এই ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। এটি কবে থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে এবং কার বেতন কত বাড়ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারি চাকরিজীবীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোতে কাজ করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। সাধারণ কর্মচারীদের এই কষ্ট লাঘব করতেই সরকার নতুন পে-স্কেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বাজেট ঘোষণা হলেও এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোন গ্রেডের কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বেতন ঠিক কত টাকা বাড়বে, তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।
নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি কার্যকর করা হবে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এটি কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বছর: এই সময়ে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হতে পারে।
তৃতীয় বছর: এই ধাপে গিয়ে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর নিশ্চিত করেছেন যে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। শুরুতে মূল বেতন বা বেসিক বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে একটি জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর জোরালো সুপারিশ করা হয়েছিল।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী:
সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়।
সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
বৈশাখী ভাতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বর্তমান সরকার এই সুপারিশগুলো এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে, যার ওপর ভিত্তি করেই এখন চূড়ান্ত গেজেট তৈরির কাজ চলছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসন খাতে আগের চেয়ে প্রায় ৫৪,৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশই যাবে এই নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে।
অর্থনীতিবিদরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বেতন বাড়ানোর ফলে বাজারে যাতে নতুন করে মূল্যস্ফীতি না ঘটে, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজর রাখতে হবে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না রাখলে বেতন বৃদ্ধির আসল সুফল কর্মচারীরা পাবেন না।
গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও, নতুন কাঠামোটি যখনই কার্যকর হোক না কেন, বকেয়াসহ তা পরিশোধ করার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীরা এখন অধীর আগ্রহে চূড়ান্ত গেজেটের অপেক্ষায় আছেন।
মন্তব্য করুন