
ইউরোপজুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়, বরং এটি একটি অবধারিত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। পোল্যান্ড নতুন করে যুদ্ধ সতর্কতা জারি করার পাশাপাশি জার্মানি সামরিক মহড়া চালিয়েছে এবং বাল্টিক অঞ্চলে সামরিক অনুশীলন হয়েছে। ফিনল্যান্ড সরকার নাগরিকদের মানসিকভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে আহ্বান জানিয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে গোয়েন্দাপ্রধানদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির চিত্র তুলে ধরেন। অন্যদিকে ন্যাটো রাশিয়ার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও সাইবার হামলা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা করছে। তবে সরকারি এই যুদ্ধ প্রস্তুতির বিপরীতে ইউরোপের সাধারণ শ্রমিক ও নাগরিকরা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।
যুদ্ধের এই উন্মাদনার মধ্যেই গত ১ জুলাই স্পেনে এয়ারবাসের হাজার হাজার শ্রমিক ধর্মঘটের ডাক দেন। স্পেনে এয়ারবাসের আটটি কারখানায় সামরিক পরিবহন বিমান ও বাণিজ্যিক বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। ইউজিটি এবং সিজিটি ইউনিয়নের নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলনের ফলে সামরিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এমনকি কারখানাগুলোর মধ্যে যন্ত্রাংশ পরিবহনের জন্য ইউক্রেনীয় বিশাল আকারের কার্গো বিমান ভাড়া করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সংগতি রেখে মজুরি বৃদ্ধি এবং রিমোট কাজের অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকরা পরবর্তীতে মাদ্রিদে বিশাল বিক্ষোভ করেন। দীর্ঘ দরকষাকষির পর ১ অক্টোবর শ্রমিকরা সংশোধিত প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিলে পরিস্থিতির সাময়িক অবসান ঘটে।
অন্যদিকে স্কটল্যান্ডে নতুন ট্রেন বহর তৈরির জন্য স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান সিএএফকে যুক্ত করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে রেলওয়ে ইউনিয়নগুলো। ইসরায়েলি দখলদারত্ব ও জেরুজালেমের লাইট রেল পরিচালনায় সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত এই সংস্থাকে বয়কট করার দাবি তুলেছে আরএমটি এবং আসলেফ ইউনিয়ন। ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের সম্মেলনেও সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করে প্রস্তাব পাস হয়েছে। এছাড়া গাজায় যুদ্ধের প্রতিবাদে ইউরোপের ডকশ্রমিক ইউনিয়নগুলো আন্তর্জাতিক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ নীতির বিরুদ্ধে কেবল শ্রমিকরাই নন, সরব হয়ে উঠেছে ইউরোপের নতুন প্রজন্মও। জার্মানির তরুণরা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১৮ বছর বয়সীদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পর 'স্কুল স্ট্রাইক এগেইনস্ট কনস্ক্রিপশন' আন্দোলনের ব্যানারে ৪৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে আসে। ইউরোপীয় রাজনীতির মূলধারার রাজনীতিবিদদের যুদ্ধ উন্মাদনার বিপরীতে সাধারণ মানুষ ও তরুণরা তাঁদের জীবনযাত্রার মান এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এই যুদ্ধ অর্থনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
ইউরোপের এই বহুমুখী সংকটে যুদ্ধ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অধিকারের লড়াইটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। একদিকে সরকারগুলোর সামরিক শক্তি বাড়ানোর তোড়জোড়, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমিক ও তরুণদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান ইউরোপীয় রাজনীতির সমীকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।