
অক্টোবরের মাঝামাঝি আসতেই ঢাকার সন্ধ্যায় নামতে শুরু করেছে হালকা ঠান্ডা। দিনের বেলায় এখনো গরমের দাপট, কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বাতাসে শীতের ছোঁয়া। এই ঋতুবদলের সময় পোশাক বাছাই নিয়ে দ্বিধায় পড়েন অনেকেই। স্টাইল সচেতনদের জন্য এই সময়ের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো লেয়ারিং, অর্থাৎ একাধিক পাতলা স্তরের পোশাক পরা। ভারী জ্যাকেটের এখনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু সঠিক লেয়ারিংয়ে সন্ধ্যার ঠান্ডা সহজেই সামলানো যায়, আবার দিনের গরমেও অস্বস্তি হয় না।
লেয়ারিং শুরু হয় ভেতরের আরামদায়ক পোশাক দিয়ে। সুতির টি-শার্ট বা পাতলা শার্ট ভালো ভিত্তি হতে পারে। এর ওপরে পরুন ওপেন শার্ট, হালকা কার্ডিগান বা পাতলা ডেনিম জ্যাকেট। দিনের বেলায় গরম লাগলে উপরের স্তরটি খুলে হাতে রাখা যায়, সন্ধ্যায় ঠান্ডা বাড়লে আবার পরে নেওয়া যায়। এভাবে একই পোশাকে সারাদিনের আবহাওয়ার ওঠানামা সামলানো সম্ভব। মেয়েদের জন্য কুর্তির ওপরে হালকা শ্রাগ বা লং কার্ডিগানও চমৎকার লেয়ারিং বিকল্প।
রঙের সমন্বয়ে একটু মনোযোগ দিলেই লুকটা হয়ে ওঠে পরিপাটি। ভেতরে হালকা রঙ আর বাইরে গাঢ় বা নিরপেক্ষ রঙের মিল চোখে ভালো লাগে। বেজ, অলিভ, নেভি ব্লু বা মেরুন রঙ শরতের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই। কাপড় হিসেবে সুতি, লিনেন মিশ্রণ বা হালকা বুননের কাপড় বেছে নিন, যাতে বাতাস চলাচল করে এবং ঘামে ভেজা অনুভূতি না হয়। খুব মোটা বা ভারী কাপড় এই সময় এড়িয়ে চলাই ভালো।
পায়ের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। এই সময় স্যান্ডেলের বদলে স্নিকার্স বা লোফার বেশি স্বস্তিদায়ক। সঙ্গে একটা পাতলা স্কার্ফ রাখলে রাতের ঠান্ডা বাতাস থেকে গলা রক্ষা পায়। তবে মনে রাখবেন, সব স্তর একসঙ্গে পরার দরকার নেই। আবহাওয়া বুঝে স্তর কমানো বা বাড়ানোই লেয়ারিংয়ের আসল কৌশল। সকালে বেরোনোর আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও সহজ হয়। একটু পরিকল্পনা করলেই শরতের এই মনোরম সময়টায় স্টাইল আর আরাম দুটোই পাশাপাশি চলতে পারে।
লেয়ারিংয়ে কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলুন। অনেকেই একসঙ্গে অনেক মোটা স্তর পরে ফেলেন, ফলে দেখায় ভারী আর অস্বস্তি হয়। মনে রাখবেন, লেয়ারিংয়ের সৌন্দর্য পাতলা স্তরে। প্রতিটি স্তর যেন আলাদাভাবে পরা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। আরেকটি ভুল হলো সব স্তরে একই রঙ বা একই প্রিন্ট ব্যবহার করা। ভিন্ন টেক্সচার, যেমন সুতির সঙ্গে ডেনিম বা বুনন কাপড়ের সঙ্গে লিনেন মিলিয়ে পরলে লুকটা হয় আরও আকর্ষণীয়। অফিসে যাওয়ার সময় ব্লেজারের নিচে পাতলা টার্টলনেক পরেও তৈরি করা যায় শীতের স্মার্ট লুক।
অফিসে লেয়ারিংয়ের নিয়মটা একটু ভিন্ন। এখানে দেখতে হবে পেশাদার, আবার আরামও চাই। শার্টের ওপরে হালকা ব্লেজার বা নিট ব্লেজার পরলে ফরমাল লুক থাকে, আবার ঠান্ডাও সামলানো যায়। ভেতরে পাতলা টার্টলনেক বা হাই নেক পরলে গলা ঢাকা থাকে, টাই ছাড়াই পরিপাটি দেখায়। মেয়েদের জন্য শাড়ি বা সালোয়ারের ওপরে হালকা লং কোট বা শ্রাগ অফিসে মানানসই। মনে রাখবেন, অফিসে খুব বেশি স্তর না পরাই ভালো, দুই থেকে তিনটি স্তরই যথেষ্ট। বেশি স্তর হলে চলাফেরায় অস্বস্তি হয়, আর দেখতেও ভারী লাগে।
ভ্রমণের সময় লেয়ারিং প্রায় অপরিহার্য। দূরের বাস বা লঞ্চে এসির ঠান্ডা অনেকেরই সহ্য হয় না। এমন যাত্রায় একটা হালকা জ্যাকেট বা শাল ব্যাগে রাখুন। পাহাড়ি এলাকায় গেলে, যেমন বান্দরবান বা সিলেটের চা বাগানে, সন্ধ্যার পর ঠান্ডা বেশ বেড়ে যায়। সেখানে দিনের টি-শার্টের ওপরে সন্ধ্যায় ফ্লিস জ্যাকেট বা মোটা কার্ডিগান কাজে লাগে। ভ্রমণে এমন পোশাক নিন যা ভাঁজ করে ছোট করা যায়, ব্যাগে জায়গা কম নেয়।
কাপড় চেনা লেয়ারিংয়ের বড় অংশ। সুতি কাপড় বাতাস চলাচলে ভালো, ঘাম শোষণ করে। লিনেন আরও হালকা, তবে সহজে কুঁচকে যায়। শীতের জন্য উলের মিশ্রণ ভালো, তবে খাঁটি উল অনেকের ত্বকে চুলকায়, তাই মিশ্রণ বেছে নিন। ভেতরের স্তরে সিনথেটিক কাপড় ঘাম আটকে অস্বস্তি বাড়ায়, তাই ভেতরে সুতি রাখাই ভালো। বাইরের স্তরে হালকা পলিয়েস্টার মিশ্রণ চলতে পারে, কারণ এতে বাতাস আটকায়। কেনার সময় কাপড় হাতে নিয়ে দেখুন, নরম ও হালকা লাগলে ভালো।
বাজেটে লেয়ারিং করাও সম্ভব। আলমারিতে থাকা পুরনো শার্টই ওপেন শার্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বড় সাইজের শার্ট মেয়েদের ওপরে শ্রাগের মতো পরা যায়। লোকাল মার্কেটে কম দামে ভালো কার্ডিগান পাওয়া যায়, শুধু সেলাই আর কাপড় দেখে কিনুন। একটা নিরপেক্ষ রঙের জ্যাকেট কিনলে সেটা প্রায় সব পোশাকের সঙ্গে চলে, আলাদা আলাদা কেনার দরকার হয় না।
লেয়ারিং পোশাকের যত্নও জরুরি। পাতলা কার্ডিগান বা সোয়েটার হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলে কাঁধের কাছে ঝুলে যায়, ভাঁজ করে রাখাই ভালো। ধোয়ার সময় উলের মিশ্রণ ঠান্ডা পানিতে হাতে ধুন, মেশিনে দিলে সংকুচিত হতে পারে। প্রতিটি ঋতু শেষে পোশাক রোদে দিয়ে বাক্সে তুলে রাখুন, পরের বছর আবার ব্যবহার করা যাবে।
স্কার্ফ বা ওড়না দিয়েও লেয়ারিংয়ে আনা যায় রঙের ছোঁয়া। একরঙা পোশাকের ওপরে ছাপা স্কার্ফ পরলে লুকটা হয় প্রাণবন্ত। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় পাতলা শাল কাঁধে নিলে শীতও সামলানো যায়, স্টাইলও থাকে। স্কার্ফ বাঁধার ধরন বদলেও একই পোশাকে আসে ভিন্নতা।
রাতের অনুষ্ঠানে লেয়ারিংয়ে একটু চাকচিক্য যোগ করুন। কালো পোশাকের ওপরে সিল্কের স্কার্ফ বা হালকা ঝকঝকে শ্রাগ পরলে পার্টি লুক তৈরি হয়। মেয়েরা কামিজের ওপরে এমব্রয়ডারি করা লং কোট পরতে পারেন। মনে রাখবেন, রাতের আলোয় গাঢ় রঙ আরও সুন্দর দেখায়, তাই সন্ধ্যার লেয়ারিংয়ে গাঢ় শেড বেছে নিন।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।