
ঢাকা: বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের অবদান স্মরণ করা হলেও তাদের সামাজিক অবস্থান ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সম্প্রতি দেশের একটি স্কুলে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের গভীর সংকটকে ফুটিয়ে তুলেছে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু সেই শিক্ষকের পেশাগত নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা আজ নানা প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা অভিজ্ঞতা রয়েছে। মার্কিন শিক্ষক রবার্ট কেন্ডালের লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুলে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, জটিল সামাজিক বাস্তবতায় শুধু করুণা দিয়ে শিক্ষকতা চলে না, বরং শিক্ষার্থীর সক্ষমতাকে স্বীকার করে সমতার ভিত্তিতে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। বাংলাদেশেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ধরন বদলেছে, তবে শ্রদ্ধা ও মানবিকতার জায়গাটি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকের ভুল হতে পারে বা তার সঙ্গে মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু তার সমাধান কখনোই শারীরিক আক্রমণ বা দলবদ্ধ হামলা হতে পারে না।
শিক্ষককে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই, আবার তাকে অপমানের পাত্রও বানানো ঠিক নয়। শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন, পদোন্নতি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের বৈষম্য। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষকরা তাদের যোগ্যতার যথাযথ সুযোগ-সুবিধা পান না। বেতন কেবল অর্থের প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক মর্যাদারও সূচক। যে পেশার মানুষের হাতে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, সেখানে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার মতো কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষককে যদি শ্রেণিকক্ষে অপমান করা হয় এবং আর্থিকভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা হয়, তবে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা আশা করা যায় না। শিক্ষকতা পেশাকে শুধু চাকরি হিসেবে না দেখে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু জনতার হাতে বিচার বিদ্যালয়কে প্রতিশোধের জায়গায় পরিণত করে। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত বিবেকবান মানুষ তৈরি করা এবং শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার মাধ্যমে সমাজের মূল্যবোধের ভিত শক্ত করা।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।