সংক্ষেপে মূল তথ্য
- ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও জিও প্ল্যাটফর্মসের ৩০ হাজার ২১৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির সাবস্ক্রিপশন চলছে।
- ২১ অক্টোবর শুরু হওয়া আবেদন শেষ হবে ২৩ অক্টোবর, আর শেয়ার তালিকাভুক্ত হবে ২৮ অক্টোবর।
- সাবস্ক্রিপশন শুরুর আগেই অ্যাংকর বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এসেছে ৮ হাজার ১০৯ কোটি টাকার বেশি।
ভারতের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিওর সাবস্ক্রিপশন এখন পুরোদমে চলছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের ডিজিটাল ও টেলিকম শাখা জিও প্ল্যাটফর্মসের ৩০ হাজার ২১৩ কোটি টাকার এই শেয়ার বিক্রি শুরু হয়েছে বুধবার (২১ অক্টোবর)। আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চলছে আবেদনের দ্বিতীয় দিন, সাবস্ক্রিপশন শেষ হবে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর)। সব ঠিক থাকলে ২৮ অক্টোবর বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (বিএসই) ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) তালিকাভুক্ত হবে জিওর শেয়ার।
এই আইপিওতে বিক্রি হচ্ছে ২৭ কোটি নতুন শেয়ার, পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের কোনো শেয়ার বিক্রির অংশ এতে নেই, পুরো টাকাটাই যাবে কোম্পানির ঘরে। শেয়ারের দামের ব্যান্ড ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৫ থেকে ১ হাজার ১১৯ টাকা। এক লটে রয়েছে ১২টি শেয়ার, ফলে সর্বোচ্চ দামে আবেদন করতে হলে একজন খুচরা বিনিয়োগকারীর কমপক্ষে ১৩ হাজার ৪২৮ টাকা লাগবে। ব্যান্ডের সর্বোচ্চ দামে ইস্যুটির মোট আকার দাঁড়ায় ৩০ হাজার ২১৩ কোটি টাকা, আর সেই হিসাবে কোম্পানিটির বাজারমূল্য গিয়ে ঠেকে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ কোটি টাকায়।
বিনিয়োগকারীদের সাড়া প্রথম দিন থেকেই ছিল চোখে পড়ার মতো। বুধবার সাবস্ক্রিপশনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইস্যুটি পুরোপুরি সাবস্ক্রাইব হয়ে যায়, যেখানে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ। দ্বিতীয় দিনে গতি আরও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া এনএসইর হিসাবে মোট সাবস্ক্রিপশন ছাড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ গুণ, প্রাতিষ্ঠানিক অংশে আবেদন পড়েছে ১৩ গুণের বেশি, আর খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশও পুরোপুরি পূরণ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম।
মূল সাবস্ক্রিপশন শুরুর আগেই বড় অঙ্কের টাকা তুলে নিয়েছে জিও। সোমবার (১৯ অক্টোবর) অ্যাংকর বিনিয়োগকারীদের জন্য রাখা অংশে ২১২ জন বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ার বরাদ্দ দিয়ে কোম্পানিটি সংগ্রহ করেছে ৮ হাজার ১০৯ কোটি টাকার বেশি, প্রতিটি শেয়ার বিক্রি হয়েছে ব্যান্ডের সর্বোচ্চ দাম ১ হাজার ১১৯ টাকায়। এই অংশে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ পেয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা প্রতিষ্ঠান এলআইসি, প্রায় ৫০০ কোটি টাকার। ব্ল্যাকরক, ফিডেলিটি, ক্যাপিটাল গ্রুপের মতো বৈশ্বিক তহবিলের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের জিআইসি, আবুধাবির এডিআইএ, কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি ও নরওয়ের নরজেস ব্যাংকের মতো সার্বভৌম তহবিলও অ্যাংকর তালিকায় রয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অ্যাংকর অংশের জন্য মোট আবেদন এসেছিল আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি, যা বরাদ্দের তুলনায় ৩০ গুণেরও বেশি।
ইস্যুর কাঠামো অনুযায়ী, নিট ইস্যুর ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য, ১৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আর ৩৫ শতাংশ খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য। এ ছাড়া রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সংরক্ষিত আছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং কর্মীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ, কর্মীরা শেয়ারপ্রতি ৫৪ টাকা ছাড়ও পাচ্ছেন। আইপিও থেকে তোলা অর্থের বড় অংশ, সর্বোচ্চ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত, যাবে জিওর মূল সহযোগী প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স জিও ইনফোকমের ঋণ শোধে, বাকিটা ব্যয় হবে সাধারণ করপোরেট কাজে।
আকারের দিক থেকে এই ইস্যু পেছনে ফেলছে আগের সব রেকর্ড। এত দিন ভারতের সবচেয়ে বড় আইপিও ছিল ২০২৪ সালে হুন্দাই মোটর ইন্ডিয়ার ২৭ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার ইস্যু। জিওর আইপিও সেই অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা রিলায়েন্স জিও খুব অল্প সময়ে ভারতের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটরে পরিণত হয়েছে, চলতি বছরের জুন শেষে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ছিল ৫৩ কোটির বেশি। মূল প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ তালিকাভুক্তির পরও জিও প্ল্যাটফর্মসের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাই ধরে রাখবে।
বাজারে আলোচনায় রয়েছে ধূসর বাজার বা গ্রে মার্কেটের প্রিমিয়াম নিয়েও। বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ট্র্যাকারের হিসাবে জিওর শেয়ারের গ্রে মার্কেট প্রিমিয়াম শেয়ারপ্রতি ২৩৫ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে মনে রাখা দরকার, এই গ্রে মার্কেট সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার, ট্র্যাকারভেদে ও সময়ভেদে এই অঙ্ক বদলে যায়, আর এটি কোনোভাবেই তালিকাভুক্তির দিনের দামের নিশ্চয়তা দেয় না। চূড়ান্ত ইস্যু মূল্য ঠিক হবে সাবস্ক্রিপশন শেষ হওয়ার পর।
আবেদনকারীদের জন্য সামনের সময়সূচি মোটামুটি ঠিক হয়ে আছে। ২৬ অক্টোবর চূড়ান্ত হবে শেয়ার বরাদ্দের ভিত্তি, ২৭ অক্টোবর বরাদ্দ পাওয়াদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে শেয়ার পৌঁছানোর কথা রয়েছে, আর ২৮ অক্টোবর দুই স্টক এক্সচেঞ্জে শুরু হবে লেনদেন। চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় সব আবেদনকারীর ভাগ্যে শেয়ার জুটবে না, বরাদ্দ হবে আনুপাতিক হারে।