
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা ব্যবসায়িক সংকট দেখা দিলেই কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নেয় অধিকাংশ করপোরেট প্রতিষ্ঠান। তবে এই প্রচলিত ধারার সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদ্যুতিক উপকরণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দ্য গ্যান্ড কোম্পানি। ১৯৫১ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে দীর্ঘ ৭৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি কর্মীকেও চাকরিচ্যুত করেনি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমশক্তির নমনীয় ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এই অভাবনীয় সাফল্য ধরে রেখেছে।
১৯৫১ সালে সাবেক ক্যান্ডি বিক্রেতা এড গান্ডের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় কোম্পানিটির। দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি পরিচালন কাঠামো বজায় রেখেছে, যেখানে ব্যবসার চাহিদা কমে গেলে কর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়ার বদলে উৎপাদন ও শ্রম ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মী নিয়ে পরিচালিত এই কোম্পানির বার্ষিক বিক্রি প্রায় ৪০ কোটি ডলার। গত এক দশকে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ১৮ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং একই সময়ে দ্বিগুণ হয়েছে মুনাফার মার্জিন।
প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ কারখানায় চাহিদা কমে গেলে কর্মী ছাঁটাই করা হলেও গ্যান্ড কোম্পানির নীতি সম্পূর্ণ আলাদা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনের চাহিদা বাড়লেই বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মী নিয়োগ না করে বিদ্যমান কর্মীদের ওভারটাইমের মাধ্যমে বাড়তি উৎপাদন সামলানোর চেষ্টা করে। ফলে চাহিদা কমে গেলে কর্মীদের চাকরি বাদ না দিয়েই শ্রমঘণ্টা কমিয়ে আনার সুযোগ থাকে।
গ্যান্ড কোম্পানির সাফল্যকে শুধু মানবিক নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা। ২০০৯ সালে কর্মীদের জন্য চালু করা হয় এমপ্লয়ি স্টক ওনারশিপ প্ল্যান বা কর্মীদের শেয়ার মালিকানা কর্মসূচি। এই ব্যবস্থার আওতায় কর্মীরা কোম্পানির ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হন। এছাড়া কারখানায় শিক্ষানবিস পর্যায়ের একজন কর্মীও ওভারটাইম ও মুনাফা ভাগাভাগির অর্থ বাদ দিয়ে বছরে গড়ে ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার ডলার আয় করেন। কোম্পানির বিভিন্ন পদের বেতনসীমা এবং আর্থিক হিসাবের বিবরণী অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশ করায় কর্মীদের মধ্যে মালিকানা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের এই সাফল্য বজায় রাখতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সামনে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মীদের মধ্যে ওভারটাইম শিফটে কাজ করার আগ্রহ আগের তুলনায় কিছুটা কমছে। এছাড়া দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণে দক্ষ ব্যবস্থাপক তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে একই নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। তবে ৭৫ বছরের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মীসুলভ মনোভাব থাকলে সংকটকালেও ছাঁটাই ছাড়াই ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন সম্ভব।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।