
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বিপরীতে কিন্ডারগার্টেন ও মাদরাসায় শিক্ষার্থী বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। মানসম্মত শিক্ষার অভাব, শিক্ষকদের জবাবদিহির ঘাটতি এবং প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির অনুপস্থিতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক দশকে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন ও আকর্ষণীয় করতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে নতুন বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, সুসজ্জিত একাডেমিক ভবন নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের পরও সরকারি স্কুলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অভিভাবকরা। একসময়কার গ্রামীণ বিদ্যালয়ের চিত্র বদলে গেলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর হতাশা।
मध्यবিত্ত অভিভাবকরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। এজন্য সন্তানদের তারা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করছেন। অন্যদিকে দরিদ্র অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তারা তাদের সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে উদাসীনতা কাজ করছে। নামমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতায় চাকরিতে প্রবেশ এবং নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকছে। এমনকি খোদ সরকারি চাকরিজীবী বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নিজেদের সন্তানদের এসব স্কুলে না পাঠিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ক্রমান্বয়ে নিম্নবিত্তের স্কুলে রূপ নিচ্ছে।
ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তুলনা করলে আমাদের অবকাঠামোগত ও পাঠদান পদ্ধতির ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফ্রেন্ড ও সুইডেনের মতো দেশে খেলাধুলা, আনন্দময় পরিবেশ এবং প্রায়োগিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটানো হয়। অথচ আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মুখস্থ নির্ভর ও গতানুগতিক ধারা এখনো বজায় রয়েছে, যা আধুনিক যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা সমাজ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। শিক্ষার মূল ভিত্তি মজবুত না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি বাধাগ্রস্ত হবে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে আবারও আস্থার প্রতীকে পরিণত করার কোনো বিকল্প নেই।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।