রাজধানীর মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের নাম তানিম রেজা ওরফে বাপ্পি। সময় ও সুযোগ বুঝে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করলেও তার অপরাধের ধরণে কোনো বদল আসেনি। এক সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে দাবি করতে শুরু করেন। তবে পরিচয় যা-ই হোক না কেন, তার মূল কাজ ছিল দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, বাস কাউন্টার, ফুটপাত এবং ইন্টারনেট ব্যবসা থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা। আর কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই তার ওপর নেমে আসত অবর্ণনীয় নির্যাতন, এমনকি প্রকাশ্যে গুলি করার ঘটনাও ঘটত।
পুলিশের তদন্ত থেকে জানা যায় যে ২০০২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের হাত ধরে তানিম রেজার অপরাধ দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটে। এরপর সে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বড় বড় ঠিকাদারি কাজ বা দরপত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তানিম তার অস্ত্রধারী দল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের ভয় দেখাত। বর্তমানে দুবাইয়ে থাকা জিসান এবং পলাতক সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের সঙ্গে এখনো তানিমের যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সম্প্রতি দক্ষিণ কমলাপুরের কোরবানির পশুর হাটের একজন ইজারাদারের কাছে একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ব্যবসায়ী টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় চার দিনের মাথায় তার ‘এআই কার্গো সার্ভিস’ নামক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালানো হয়। এই ঘটনার পর মতিঝিল থানায় মামলা হলে পুলিশ তদন্তে নেমে তানিম রেজার সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়।
কমলাপুরের ওই ঘটনার পর তানিম ও তার সহযোগীরা গা ঢাকা দেয়। প্রায় দুই মাস ধরে কঠোর নজরদারির পর অবশেষে ১৭ জুলাই সকালে মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণী এলাকা থেকে তানিম রেজাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইস্টার্ন কমলাপুর হাউজিংয়ের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৩টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রচুর গুলি, একটি বৈদ্যুতিক শক গান এবং একটি কুড়াল উদ্ধার করা হয়।
এই অভিযানে তানিমের প্রধান সহযোগী রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে রিজনসহ আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তানিমের অধীনে সাত থেকে নয়জনের একটি ‘শুটার বাহিনী’ কাজ করত, যাদের কাছে বেশ কিছু অবৈধ ভারতীয় অস্ত্র রয়েছে। এই দলের অন্য সদস্যদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত আছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তানিম রেজার বিরুদ্ধে আগে থেকেই চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যাচেষ্টা এবং মাদক সংক্রান্ত অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। এর বাইরে ২০০৩ সালে মালিবাগের একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চলাকালীন দুই পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতেও এই তানিমের নাম এসেছিল। বর্তমানে ব্যবসায়ীকে হুমকি ও গুলি করার মামলায় আদালত তানিম ও তার সহযোগী রিজনকে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। পুলিশ এখন এই চক্রের অস্ত্রের উৎস এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
মন্তব্য করুন