
বাংলাদেশের বর্ষা আর শীত, দুটো মৌসুমই গর্ভবতী মায়ের জন্য বাড়তি সতর্কতার সময়। আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে সর্দি, জ্বর ও মশাবাহিত অসুখের ঝুঁকি বাড়ে। মৌসুম অনুযায়ী একটু সচেতন থাকলেই এই সময়টা নিরাপদে কাটানো সম্ভব।
বর্ষায় মশা থেকে নিজেকে বাঁচানো সবচেয়ে জরুরি। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন, কারণ সেখানেই মশা জন্মায়। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন। বাইরে বের হলে লম্বা হাতার পোশাক পরুন। শরীরে মশার কামড় এড়াতে জানালায় নেট লাগানো ভালো অভ্যাস। জ্বর বা শরীরে ব্যথা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
বর্ষায় নিরাপদ পানির দিকে বিশেষ নজর দিন। বৃষ্টির পানিতে রাস্তার নোংরা মিশে পানিবাহিত অসুখের ঝুঁকি বাড়ে। খাবার পানি সবসময় ফুটিয়ে বা নিরাপদ উৎস থেকে নিন। বাইরে বের হলে নিজের বোতলের পানি সঙ্গে রাখুন। কাটা ফল বা খোলা শরবত রাস্তার দোকান থেকে না খাওয়াই ভালো। বাড়িতে পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখুন ও নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ত্বকের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পা ভেজা থাকলে ভালো করে মুছে শুকিয়ে নিন। ভেজা জামাকাপড় বেশিক্ষণ পরে থাকবেন না। ঘরে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন। বৃষ্টিতে ভিজলে দ্রুত শুকনো কাপড় বদলে নিন এবং গরম চা বা স্যুপ পান করুন।
শীতকালে শরীর গরম রাখা জরুরি। হালকা কিন্তু উষ্ণ পোশাকের কয়েকটি স্তর পরুন, যাতে প্রয়োজনে খুলে নেওয়া যায়। সকালে কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলুন। গরম পানিতে গোসল করলে শরীর আরাম পায়, তবে পানি যেন খুব গরম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
শীতকালে শ্বাসতন্ত্রের যত্ন নিন। ঠান্ডা বাতাসে সর্দি-কাশি সহজে লাগতে পারে। সকালে কুয়াশার মধ্যে বাইরে বের না হওয়াই ভালো। ঘরে ধুলা জমতে দেবেন না, বিছানার চাদর ও বালিশের কভার নিয়মিত বদলান। ধূমপায়ী কেউ থাকলে তার থেকে দূরে থাকুন, ধোঁয়া গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর। গলা খুসখুস করলে গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করা যেতে পারে, তবে কাশি বা জ্বর বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বক ফেটে যেতে পারে। গোসলের পর শরীরে ময়েশ্চারাইজার লাগান। ঠোঁট ফাটা রোধে লিপ বাম ব্যবহার করুন। এই সময় গরম ও পুষ্টিকর খাবার খান, তবে হালকা ও সহজপাচ্য খাবার বেছে নিন।
বর্ষায় ঝড় বা শীতে কুয়াশার কারণে বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে। আগে থেকে প্রস্তুতি রাখুন। চার্জার লাইট, মোমবাতি বা চার্জার ফ্যান হাতের কাছে রাখুন। মোবাইল ফোনে চার্জ ধরে রাখুন। ফ্রিজে সংরক্ষিত খাবার দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে নষ্ট হতে পারে, তাই অল্প অল্প করে তাজা রান্না করা ভালো। মশারি টানানোর দড়ি ও খুঁটি আগে থেকে ঠিক করে রাখুন, যাতে অন্ধকারে ঝামেলা না হয়।
দুই মৌসুমেই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। বাইরে থেকে এসে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। ভিড়ের জায়গায় গেলে মাস্ক পরুন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং শরীরে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মৌসুমি ফল ও সবজি খাদ্যতালিকায় রাখুন। বর্ষায় পেয়ারা, আমড়া, জাম্বুরার মতো টক-মিষ্টি ফল রুচি বাড়াতে পারে। শীতে শাকসবজি প্রচুর পাওয়া যায়, পালং শাক, ফুলকপি, গাজর রান্নায় রাখুন। ফলমূল সবসময় ভালো করে ধুয়ে খান। ভাজাপোড়া কমিয়ে সেদ্ধ বা ঝোলের খাবার বেছে নিন, এতে হজমে সুবিধা হয়। প্রতিদিনের খাবারে ডাল, ডিম বা মাছের মতো পুষ্টিকর উপাদান রাখার চেষ্টা করুন।
খাবারের দিকেও মৌসুম অনুযায়ী নজর দিন। বর্ষায় বাইরের খোলা খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পানি এড়িয়ে চলুন। ফলমূল ভালো করে ধুয়ে খান। শীতে গরম ও সহজপাচ্য খাবার শরীরে শক্তি জোগায়। দুই মৌসুমেই নিয়মিত পানি পান করুন, কারণ শরীরে পানির ঘাটতি যেকোনো সময়েই কষ্টের কারণ হতে পারে। ঘুমের সময় ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন, যাতে ঘুম ভালো হয়।
কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন, তা জেনে রাখুন। বর্ষায় জ্বর, গায়ে ব্যথা বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি করবেন না। শীতে শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ অনুভব করলে পরামর্শ নিন। যেকোনো মৌসুমে পেটে তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা সহায়তা নিন। নিয়মিত চেকআপের তারিখ মিস করবেন না, মৌসুম বদলালেও রুটিন একই থাকে।
বর্ষায় বাইরে বের হলে যাতায়াত পরিকল্পনা আগে থেকে করুন। জলাবদ্ধ রাস্তা এড়িয়ে চলুন, কারণ পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ছাতা, রেইনকোট ও অতিরিক্ত জুতা সঙ্গে রাখুন। যানবাহনে ভিড় থাকলে পরেরটার জন্য অপেক্ষা করুন। রাস্তায় হাঁটার সময় ভালো গ্রিপের জুতা পরুন ও ধীরে চলুন। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফেরার চেষ্টা করুন।
শীতকালে ঘরে বসে থাকলেও হালকা সক্রিয়তা বজায় রাখুন। সকালে রোদ উঠলে বারান্দায় কিছুক্ষণ বসুন, রোদ শরীরে ভালো লাগে। ঘরের ভেতর ধীরে হাঁটুন বা হালকা স্ট্রেচিং করুন। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকলে পা ফুলতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো নিয়মিত হাঁটা শরীর ও মন দুটোই ভালো রাখে।
মৌসুম বদলের সময় মন খারাপ বা বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। দিনের আলো কমে গেলে বা টানা বৃষ্টিতে মন ভারী লাগা স্বাভাবিক। প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, পছন্দের কাজে মন দিন। পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত রুটিন মন ভালো রাখে। মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।