
কফি শপ, রেস্টুরেন্ট বা শপিং মলে ফ্রি ওয়াইফাই দেখলেই আমরা ফোন বের করে যুক্ত হয়ে যাই। বিনা মূল্যের ইন্টারনেট সুবিধাজনক হলেও পাবলিক ওয়াইফাইয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে। একটু সতর্ক থাকলে এই সুবিধা নিরাপদে উপভোগ করা যায়।
পাবলিক ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত অনেক ডিভাইসের মধ্যে আপনার তথ্য আড়ি পেতে দেখার সুযোগ থাকে। একই নেটওয়ার্কে থাকা কেউ চাইলে আপনার ব্রাউজ করা তথ্য নজরে রাখতে পারে। তাই ফ্রি ওয়াইফাইয়ে বসে ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন কেনাকাটার মতো আর্থিক কাজ না করাই ভালো। এসব জরুরি কাজ নিজের মোবাইল ডেটা দিয়ে করাই নিরাপদ।
ওয়াইফাইয়ে যুক্ত হওয়ার আগে নেটওয়ার্কের নাম ঠিক আছে কিনা যাচাই করুন। প্রতারকরা আসল দোকানের নামে ভুয়া হটস্পট বানিয়ে তথ্য চুরি করে। যেমন, দোকানের নামের সঙ্গে একটি অক্ষর বদলে বা অতিরিক্ত শব্দ জুড়ে নকল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়। দোকানের কর্মীদের জিজ্ঞেস করে সঠিক নেটওয়ার্কের নাম জেনে নিন। পাসওয়ার্ড ছাড়া খোলা নেটওয়ার্কে আরও বেশি সতর্ক থাকুন।
অনেক জায়গায় ওয়াইফাইয়ে যুক্ত হতে ফোন নম্বর দিয়ে সাইন ইন করতে হয় বা একটি পেজে তথ্য দিতে হয়। এতে আপনার কিছু তথ্য সংগ্রহ হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়াই ভালো। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই দিন। এই পেজগুলোতে ব্যাংকের পিন বা পাসওয়ার্ডের মতো তথ্য কখনো দেবেন না।
ফোনে ফাইল শেয়ারিং বা এয়ারড্রপের মতো ফিচার পাবলিক জায়গায় বন্ধ রাখুন। আইফোনে এয়ারড্রপের সেটিং "কন্টাক্টস অনলি" বা বন্ধ রাখুন। অ্যান্ড্রয়েডে নিয়ারবাই শেয়ার প্রয়োজনে চালু করুন। কাজ শেষ হলে ওয়াইফাই থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং ফোনের "স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হোন" অপশন বন্ধ রাখুন। এতে অজান্তে ভুয়া নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
ব্রাউজ করার সময় ওয়েবসাইটের ঠিকানায় তালার চিহ্ন আছে কিনা দেখে নিন। তালা চিহ্ন মানে ব্রাউজার ও ওয়েবসাইটের মধ্যে সংযোগ নিরাপদ। তালা ছাড়া সাইটে লগইন বা ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না। ব্যাংক বা গুরুত্বপূর্ণ সাইটের ঠিকানা নিজে টাইপ করে ঢুকুন, সার্চের ফলাফলের লিংকে চাপ না দিয়ে।
নিয়মিত ফোনের সফটওয়্যার আপডেট রাখলেও নিরাপত্তা অনেকটা জোরদার হয়। আপডেটে নিরাপত্তার দুর্বলতা ঠিক করা হয়। তাই আপডেট এলে দেরি না করে ইনস্টল করুন। পুরনো সফটওয়্যারে ঝুঁকি বেশি থাকে।
যারা নিয়মিত বাইরে থেকে কাজ করেন, তাদের জন্য ভিপিএন একটি ভালো সমাধান হতে পারে। ভিপিএন আপনার ইন্টারনেট সংযোগকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে, যাতে একই নেটওয়ার্কের অন্য কেউ তথ্য দেখতে না পারে। তবে বিনা মূল্যের অচেনা ভিপিএন অ্যাপ ব্যবহার না করে নির্ভরযোগ্য সেবা বেছে নিন। ভিপিএন বাছার সময় প্রতিষ্ঠানের সুনাম, পরিষ্কার নীতিমালা ও ভালো রিভিউ দেখে নিন।
অ্যাকাউন্টগুলোতে দুই ধাপে যাচাইকরণ চালু থাকলে পাবলিক ওয়াইফাইয়ের ঝুঁকি অনেক কমে। পাসওয়ার্ড কেউ দেখে ফেললেও ফোনের অনুমতি ছাড়া অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারবে না। ইমেইল, ফেসবুক ও ব্যাংকিং অ্যাপে এই সুবিধা চালু করে রাখুন।
পাবলিক নেটওয়ার্কে কাজ শেষে লগআউট করতে ভুলবেন না। ইমেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে থাকলে বেরিয়ে আসুন। বাড়ি ফিরে পাবলিক নেটওয়ার্কটি ফোনের সংরক্ষিত তালিকা থেকে মুছে দিন। আইফোনে ওয়াইফাই সেটিংসে নেটওয়ার্কের পাশের তথ্য চিহ্নে গিয়ে "ফরগেট দিস নেটওয়ার্ক" করা যায়। অ্যান্ড্রয়েডেও সংরক্ষিত নেটওয়ার্ক মুছে দেওয়ার অপশন আছে। এতে পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো সম্ভব হলে নিজের মোবাইল ডেটা ব্যবহার করা। জরুরি বা সংবেদনশীল কাজ পাবলিক ওয়াইফাইয়ে না করে মোবাইল ডেটায় সেরে নিন। ছোট এই অভ্যাসগুলো মিলিয়ে আপনার অনলাইন নিরাপত্তা অনেক শক্তিশালী হবে। নিরাপদে থাকুন, নিশ্চিন্তে ইন্টারনেট ব্যবহার করুন। সচেতনতাই অনলাইন জগতে আপনার সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
হোটেল বা বিমানবন্দরের ওয়াইফাইয়েও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। অনেক জায়গায় নেটওয়ার্কের নাম একাধিক দেখা যায়, সঠিকটি কর্মীদের জিজ্ঞেস করে নিন। দীর্ঘ ভ্রমণে নিজের মোবাইল ডেটা ব্যবহার করা বেশি নিরাপদ। জরুরি কাজ থাকলে হটস্পটের বদলে সরাসরি ডেটা ব্যবহার করুন।
পাবলিক জায়গায় ব্লুটুথও বন্ধ রাখুন, যদি ব্যবহার না করেন। চালু ব্লুটুথ দিয়ে কাছের ডিভাইস থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত সংযোগের চেষ্টা হতে পারে। ফোনের লোকেশন শেয়ারিংও অপ্রয়োজনে বন্ধ রাখুন। খোলা নেটওয়ার্কে এই তথ্যগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে। প্রয়োজনে পরে আবার চালু করা যায়।
সংক্ষেপে মনে রাখুন: সঠিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হোন, আর্থিক কাজ এড়িয়ে চলুন, তালা চিহ্ন দেখে ব্রাউজ করুন, কাজ শেষে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন ও নেটওয়ার্ক মুছে দিন। এই অভ্যাসগুলোই পাবলিক ওয়াইফাইয়ের বেশিরভাগ ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
কোনো ওয়েবসাইটে লগইন করার সময় "মনে রাখুন" বা "স্টে সাইনড ইন" টিক দেবেন না পাবলিক নেটওয়ার্কে। এতে পরে অন্য কেউ সেই ডিভাইস বা নেটওয়ার্ক থেকে আপনার অ্যাকাউন্টে ঢোকার সুযোগ পেতে পারে। ব্যক্তিগত ডিভাইসেও পাবলিক জায়গায় এই অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
শিশুদের হাতে ফোন দিয়ে পাবলিক ওয়াইফাইয়ে ছেড়ে দেবেন না। তারা না বুঝে সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে দিতে পারে বা ভুয়া লিংকে চাপ দিতে পারে। বাচ্চাদের জন্য নিজের মোবাইল ডেটার হটস্পট বেশি নিরাপদ।
ভ্রমণের আগে ফোনে প্রয়োজনীয় তথ্য অফলাইনে নামিয়ে রাখুন। ম্যাপ, টিকিট ও হোটেলের ঠিকানা সংরক্ষণ করলে পাবলিক ওয়াইফাইয়ের উপর নির্ভর করতে হয় না। প্রস্তুতি থাকলে যাত্রা নিশ্চিন্ত হয়।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।