
ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক নবাব পরিবারের বাসভবন আহসান মঞ্জিল বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক প্রাসাদের ৯ নম্বর গ্যালারিতে সংরক্ষিত আছে নবাব আমলের পাঁচটি বিশাল লোহার সিন্দুক। একসময় যে সিন্দুকগুলো নবাব পরিবারের কেন্দ্রীয় ভল্ট বা ব্যক্তিগত কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি খোলা হয়েছে এবং বাকি তিনটি সিন্দুক এখনো তালাবদ্ধ রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই সিন্দুকগুলোর ভেতরে ঠিক কী রয়েছে, তা নিয়ে পুরান ঢাকাসহ দেশজুড়ে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও নানা কল্পকাহিনি।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার নবাব পরিবারে ধনসম্পদের প্রাচুর্যের সময় টাকা ও মূল্যবান অলংকার সংরক্ষণের জন্য সিন্দুকগুলো যুক্তরাজ্য থেকে আনা হয়েছিল। সিন্দুকে খোদাই করা তথ্য অনুযায়ী, এগুলোর প্রস্তুতকারক যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'চাব্স'। কলকাতার এজেন্ট 'দ্য থমসন অ্যান্ড কোং' এর মাধ্যমে সিন্দুকগুলো আহসান মঞ্জিলে আনা হয়। ১৯৫২ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় নবাব এস্টেট অধিগ্রহণের পর এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে আহসান মঞ্জিল সংস্কার করে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এরপর ১৯৮৭ ও ১৯৯১ সালে বিশেষ কমিটির তত্ত্বাবধানে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দুটি সিন্দুক খোলা হলেও ভেতরে কোনো মূল্যবান রত্ন বা সোনা পাওয়া যায়নি।
আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের উপকিপার দিবাকর সিকদার এ বিষয়ে জানান, তালাবদ্ধ সিন্দুকগুলো দর্শনার্থীদের মধ্যে সবসময়ই দারুণ কৌতূহল তৈরি করে। কিন্তু এগুলোর জটিল লকিং সিস্টেম ও ঐতিহাসিক সংরক্ষণের স্বার্থে বাকিগুলো আর খোলা হয়নি। প্রথম আলোতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে প্রথম সিন্দুকটি কাটার পর জনমনে সোনা বা হীরা পাওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। তৎকালীন নিরাপত্তারক্ষী আবদুস সাত্তার মিয়া জানান, সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সিন্দুক কাটা হলেও ভেতরে কিছু না পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন কর্মকর্তারা। এমনকি বুয়েটের উপাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটিও পরবর্তীতে ড্রিল ও পেছনের অংশ খুলে সিন্দুকগুলো খালি পায়।
সবচেয়ে বড় সিন্দুকটির উচ্চতা ২৫৪ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ১৪৮ সেন্টিমিটার, যাতে ৯৪টি লকার বা দেরাজ রয়েছে। বাকি চারটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটির উচ্চতা ১৮০ ও চওড়া ৬৫ সেন্টিমিটার এবং অন্যটি কিছুটা বড়। ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে প্রতীকী মূল্যে সিন্দুকগুলো জাতীয় জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া ইতিহাস বলছে, ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ 'দরিয়া-ই-নূর' হীরাসহ ১০৯টি রত্ন বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিলেন, যা বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ভল্টে থাকার কথা থাকলেও সেই ভল্টও কখনো খোলা হয়নি। দীর্ঘ এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আহসান মঞ্জিলের এই প্রাচীন সিন্দুকগুলোর ভেতরের রহস্য আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।