
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমুখী চাপ ও লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণের অভিযোগ উঠছে। নাগরিক অধিকার রক্ষা সংগঠন ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, হজে যাওয়ার পথে হেনস্তা, লোকাল ট্রেনে মারধর, মসজিদ ভাঙচুর এবং অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার নানা ঘটনা ঘটছে। এহেন পরিস্থিতিতে রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে নতুন কিছু মুসলমানপ্রধান দলের উত্থান, যা ঘুরপথে বিজেপির রাজনীতি ও নির্বাচনি জয়কে আরও সহজ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই অন্তত আটটি জেলায় একাধিক আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং কলকাতা মেট্রো অঞ্চলে সহিংসতার মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। এসব ঘটনায় শুধু সাধারণ মানুষই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু ধর্মীয় স্থান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং গবাদিপশুর হাট। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন জীবিকার ক্ষেত্রেও মুসলমানদের ওপর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই সংকটের মাঝে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে অন্য একটি বিষয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ক্রোল’-এর দীর্ঘ তদন্ত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে ধীরে ধীরে একাধিক মুসলমানপ্রধান দল তৈরি হচ্ছে। এই দলগুলো মূলত সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংককে খণ্ডিত করে দিচ্ছে। ফলে তৃণমূল কংগ্রেস বা সিপিআইএমের মতো তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে বিজেপির জয়লাভের পথ প্রশস্ত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) কিংবা আমজনতা উন্নয়ন পার্টির মতো দলগুলোর তৎপরতা সংখ্যালঘু ভোটকে বিক্ষিপ্ত করে তুলছে। যেমন, গত নির্বাচনে আইএসএফ সীমিত আসনে প্রার্থী দিয়েও বহু কেন্দ্রে জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ভোট কেটেছে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে অন্য একটি দলের কার্যক্রম এবং মেরুকরণমূলক স্লোগানের কারণে হিন্দু ভোট আরও সংহত হয়ে বিজেপির বাক্সে চলে যাচ্ছে। এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক খেলায় ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ির ফলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজ শুধু শারীরিক বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাই নয়, বরং এক জটিল রাজনৈতিক বৃত্তের মধ্যে পড়েছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির খবর মিললেও, সামগ্রিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মুসলমানপ্রধান দলগুলোর উপস্থিতি এবং এর সুযোগ নিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।