
দেশের বর্তমান সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় ক্ষমতার নিয়মে আইন প্রয়োগের এক বৈষম্যমূলক চিত্র ফুটে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ছিনতাই, ভাঙচুর, জমি দখল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের জেরে এক তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের জন্য আইন অত্যন্ত কঠোর হলেও প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় শিথিল রাখা হয়। আইনের এই দ্বিচারিতা সমাজে অপরাধ প্রবণতা ও অরাজকতা বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নানা প্রান্তে পুরোনো জমির দখল ফিরে পাওয়ার নামে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে দখল, সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর বিপরীতে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের মতো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। যমুনাতীরের আলমডাঙ্গা বা এর মতো এলাকার অসহায় মানুষগুলো বারবার ভিটা হারিয়ে নদীতীরে দিন কাটালেও তাঁদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে রাষ্ট্র ও সমাজের বড় কর্তাদের দৃষ্টি কমই থাকে।
বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন যে, সমাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই। তবে দেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবা প্রাপ্তি সহজ করার নামে যত নিয়ম বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে, তা অনেক সময় দুর্নীতির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে। কঠোর নিয়মের বেড়াজালে ফাইল আটকে ঘুষের রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে। ফলে সেবা প্রত্যাশী সাধারণ নাগরিকেরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অপরাধী যে দলেরই হোক, যত বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোক না কেন, তার অন্যায় বা মিথ্যাচারের জন্য অবশ্যই কঠিন শাস্তি প্রদান করা উচিত। নমনীয় মনোভাব অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের কারণে বিচারব্যবস্থা অনেক সময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে যখন বারবার হয়রানি ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন, তখন আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা কমতে শুরু করে। এই সুযোগে একশ্রেণির মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে গণপিটুনি, ভাঙচুর বা সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সেবা কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মতো মানহানি ও সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর ক্ষতিপূরণ ও আইনি ব্যবস্থার নজির স্থাপন করা জরুরি। অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে রক্ষা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই নিয়ম হয়ে উঠবে সেবার মাধ্যম এবং আইন হবে প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার নিশ্চিত প্রতীক।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।