আটলান্টার মাঠে তখন টানটান উত্তেজনা। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু এই নাটকীয় ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে অন্য একটি ঘটনা।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে মিসরের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে দলটির প্রধান কোচ হোসাম হাসানকে দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে একটি বিশেষ ইশারা করতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয় সেই ছবি। অনেকেই তখন ভাবছিলেন, রেফারিকে উদ্দেশ্য করে দেখানো এই সংকেতের আসল রহস্য কী?
কবজি বরাবর দুই হাত আড়াআড়ি করে ‘X’ বা ক্রস চিহ্ন তৈরি করা কোনো সাধারণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি আসলে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফার একটি আনুষ্ঠানিক এবং দাপ্তরিক সংকেত। মাঠের ভেতরে বা ডাগআউটে কোনো ধরনের বর্ণবাদ অথবা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হলে ফুটবলার, কোচ কিংবা অফিশিয়ালরা এই সংকেত ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানাতে পারেন।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জোরালো করতে ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ফিফার ৭৪তম কংগ্রেসে এই নিয়মটি পাস করা হয়। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপটিই প্রথম কোনো ছেলেদের বৈশ্বিক আসর, যেখানে এই নিয়মটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
এই সংকেত দেখানোর মানেই খেলা হুট করে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী এই পরিস্থিতিতে রেফারি ধাপে ধাপে তিনটি পদক্ষেপ নিতে পারেন:
প্রথম ধাপ: পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে রেফারি সাময়িকভাবে খেলা স্থগিত রাখতে পারেন।
দ্বিতীয় ধাপ: মাঠের ভেতরে বর্ণবাদী আচরণ যদি চলতেই থাকে, তবে রেফারি খেলা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দুই দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে মাঠের বাইরে চলে যাবেন।
চূড়ান্ত ধাপ: যদি পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে ম্যাচটি পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করা হতে পারে।
ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে এসে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ যখন দলের হয়ে জয়সূচক তৃতীয় গোলটি করেন, ঠিক তখনই মিসরের কোচ এই সংকেত তোলেন। ম্যাচের ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে অবশ্য খেলা থামাননি, উল্টো প্রতিবাদ করার কারণে মিসরীয় কোচকে হলুদ কার্ড দেখান।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গোল উদযাপনের সময় প্রতিপক্ষ বা গ্যালারি থেকে বর্ণবাদী গালিগালাজ করা হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন মিসরের কোচ। তবে সুনির্দিষ্ট বা অকাট্য কোনো প্রমাণ না থাকায় এই অভিযোগের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এই ঘটনা নিয়ে এখন ফুটবল মহলে দুই ধরনের মত তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ মনে করছেন ফুটবলের স্বার্থেই রেফারির বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। অন্য পক্ষের মতে, ম্যাচ থামানোর মতো পর্যাপ্ত কোনো উপাদান বা পরিস্থিতি সেখানে তৈরি হয়নি। তবে সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, বিশ্বমঞ্চে এই নতুন নিয়মের প্রথম প্রয়োগ হিসেবে হোসাম হাসানের এই ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন