
গর্ভাবস্থা শুধু মায়ের একার যাত্রা নয়, এতে বাবার ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রীর পাশে থেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সহযোগিতা করলে এই নয় মাসের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়। ছোট ছোট যত্নই বড় ভরসা হয়ে ওঠে। প্রথমেই দরকার ধৈর্য ও বোঝাপড়া। হরমোনের পরিবর্তনে মায়ের মেজাজ ওঠানামা করতে পারে। এই সময় রাগ না করে শান্তভাবে কথা বলুন। তার অনুভূতি শুনুন, ছোটখাটো বিষয়ে তর্ক এড়িয়ে চলুন। আপনার মনোযোগই তার সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তি।
ঘরের কাজে হাত লাগান। ভারী বাজার, পানি তোলা, রান্নাঘরের কঠিন কাজগুলো নিজে করে নিন। স্ত্রীকে বিশ্রামের সুযোগ দিন। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে যান। চিকিৎসকের পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনুন, যাতে বাড়িতে সঠিক যত্ন নিতে পারেন।
খাবারের দিকেও নজর দিন। পুষ্টিকর খাবার সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিন। স্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দ বদলাতে পারে, সেটা মেনে নিন। রাতে ঘুমের সময় তার আরামের ব্যবস্থা করুন, প্রয়োজনে বালিশ সাজিয়ে দিন।
প্রসবের প্রস্তুতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিন। আগে থেকে ঠিক করে রাখুন কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাবেন, যাতায়াতের ব্যবস্থা কী হবে। জরুরি সময়ের জন্য গাড়ি বা যানবাহনের নম্বর হাতের কাছে রাখুন। হাসপাতালের ব্যাগ আগে থেকে গুছিয়ে রাখুন, যাতে তাড়াহুড়োয় কিছু বাদ না পড়ে। প্রসবের লক্ষণ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা রাখুন এবং যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
আসন্ন সন্তানের প্রস্তুতিতেও সক্রিয় থাকুন। শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পরিকল্পনা একসঙ্গে করুন। বাড়ির নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার দিকটা দেখুন। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে স্ত্রীর ওপর চাপ কমান।
সন্তান আসার আগে আর্থিক পরিকল্পনাও জরুরি। চিকিৎসা, হাসপাতাল ও শিশুর প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য একটি বাজেট ঠিক করে রাখুন। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে সঞ্চয়ের দিকে নজর দিন। স্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে অগ্রাধিকার ঠিক করুন। ভবিষ্যতের জন্য ছোট ছোট সঞ্চয় এখন থেকেই শুরু করা ভালো।
পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করুন। অনেক সময় শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ ও চাপ স্ত্রীর ওপর বাড়তি বোঝা হয়। ভালোবেসে কিন্তু দৃঢ়ভাবে সীমানা নির্ধারণ করুন। চিকিৎসকের পরামর্শের বাইরে পুরনো কুসংস্কারমূলক নিয়ম চাপিয়ে দিতে দেবেন না। পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্ত্রীর বিশ্রাম ও শান্তি নিশ্চিত করুন।
নিজের যত্নও ভুলবেন না। বাবা হিসেবে আপনার সুস্থতাও পরিবারের জন্য জরুরি। চাপ অনুভব করলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলুন। মনে রাখবেন, আপনার ইতিবাচক মনোভাব মায়ের মনে সাহস জোগায়, যা মা ও শিশু দুজনের জন্যই কল্যাণকর।
সন্তান জন্মের পরের সময়ের কথাও এখন থেকে ভাবুন। প্রথম কয়েক সপ্তাহ মায়ের বিশ্রাম ও শিশুর যত্নে আপনার উপস্থিতি অমূল্য। রাত জাগা, শিশুকে কোলে নেওয়া, মায়ের খাবারের ব্যবস্থা, এই কাজগুলোতে আগে থেকে মানসিক প্রস্তুতি নিন। কর্মক্ষেত্রে ছুটির ব্যবস্থা থাকলে সময়মতো আবেদন করুন। মনে রাখবেন, বাবা হিসেবে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ শিশুর সঙ্গেও গভীর বন্ধন গড়ে তোলে।
স্ত্রীর সঙ্গে আসন্ন সন্তান নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন। তার ভয় বা উদ্বেগ শুনুন এবং আশ্বস্ত করুন। শিশুর নাম, ঘরের ব্যবস্থা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একসঙ্গে আলোচনা করলে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ে। পারিবারিক অনুষ্ঠান বা সামাজিক চাপ থেকে স্ত্রীকে রক্ষা করুন, যাতে তিনি শান্তিতে থাকতে পারেন। আপনার এই সক্রিয় অংশগ্রহণই তাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি দেবে।
রাতে স্ত্রীর ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাতে সচেতন থাকুন। তার ঘুমানোর জায়গা আরামদায়ক রাখুন। সকালে উঠে তার জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করে দিলে দিনটা ভালো শুরু হয়। ছুটির দিনে একসঙ্গে সময় কাটান, পছন্দের জায়গায় ঘুরতে যান। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আপনাদের বন্ধন মজবুত করে এবং আসন্ন সন্তানের জন্য দুজনকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
প্রতিটি চেকআপে স্ত্রীর সঙ্গে যান এবং চিকিৎসকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। প্রশ্ন থাকলে সংকোচ না করে জিজ্ঞেস করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ নোট করে রাখুন, যাতে বাড়িতে মনে রাখতে সুবিধা হয়। পরের চেকআপের তারিখ ক্যালেন্ডারে লিখে রাখুন। আপনার উপস্থিতি স্ত্রীকে মানসিকভাবে শক্তি দেয়।
নিজে রান্না শিখুন বা সহজ রান্নায় হাত লাগান। সকালে স্ত্রীর জন্য পুষ্টিকর নাস্তা বানিয়ে দিন। তার পছন্দের খাবার কী, তা খেয়াল রাখুন। বমি ভাবের সময় হালকা ও শুকনো খাবার এগিয়ে দিন। বাইরের খাবারের বদলে ঘরের রান্নায় জোর দিন। রান্নাঘর পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও ভাগ করে নিন।
এই বিশেষ সময়টাকে উদযাপন করুন। প্রতি মাসের মাইলফলক একসঙ্গে স্মরণীয় করে রাখুন। শিশুর প্রথম ছবি যত্নে রাখুন। ছোট উপহার বা চিরকুটে স্ত্রীকে ভালোবাসা জানান। এই স্মৃতিগুলো ভবিষ্যতে আপনাদের দুজনের জন্যই অমূল্য হয়ে থাকবে।
স্ত্রীর শখ ও পছন্দের কাজে উৎসাহ দিন। গর্ভাবস্থায় অনেক নারী নিজের শখ ভুলে যান, তাকে সেগুলোতে ফিরতে সাহায্য করুন। একসঙ্গে বই পড়ুন, গান শুনুন বা পছন্দের সিনেমা দেখুন। এই আনন্দের মুহূর্তগুলো দুজনের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।প্রতিটি পর্যায়ে স্ত্রীর প্রয়োজন বদলায়, সেভাবে পাশে থাকুন। শুরুর মাসগুলোতে বমি ভাব ও ক্লান্তিতে তিনি দুর্বল থাকতে পারেন, তখন রান্না ও ঘরের বাড়তি দায়িত্ব নিজে নিন। মাঝের সময়টায় তার শরীরে স্বস্তি ফিরলে একসঙ্গে হাঁটতে বের হন বা পছন্দের কাজে সময় দিন। শেষের মাসগুলোতে শারীরিকভাবে বেশি সাহায্য দরকার হয়, ওঠাবসায় হাত বাড়িয়ে দিন, ভারী কিছু তুলতে দেবেন না।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।