
ঢাকা: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক বা কমিশনিং কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৩১তম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্লাবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। রাশিয়ার প্রযুক্তি ও নকশায় নির্মিত ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ভিভিইআর-১২০০ চুল্লির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। পরবর্তীতে এর দ্বিতীয় ইউনিটটিও চালু হলে এই কেন্দ্র থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৩১টি দেশে ৪১৭টি সক্রিয় পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে, যার মোট ক্ষমতা প্রায় ৩৮০ গিগাওয়াট।
রূপপুর প্রকল্পের মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যার ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করেছে রাশিয়া এবং বাকি ১০ শতাংশ জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা ধাপে এই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দের ফলে রূপপুরের মোট অনুমোদিত ব্যয় বেড়ে প্রায় ১.৩৯ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রাথমিক মূলধনি বিনিয়োগ অত্যন্ত বেশি হয়ে থাকে। তবে একবার এই বিশাল অবকাঠামো নির্মিত হয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম ও স্থিতিশীল থাকে।
"একটি বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য শক্তিশালী আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, দক্ষ জনবল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।" - বিশ্বব্যাংক
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। রূপপুর প্রকল্পের জন্য মূল নির্মাণ খরচের বাইরেও ভৌত নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় বড় অংকের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। আইএইএ-এর ২০২৫ সালের নিরাপত্তা পর্যালোচনায় কর্মীদের সিমুলেটরভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রশংসা করা হলেও অগ্নিনিরাপত্তা, পরিচালনাগত তদারকি এবং যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তির সঠিক মূল্যায়নে কেন্দ্রটির দৈনন্দিন উৎপাদনের পাশাপাশি এর অবসায়ন বা ডিকমিশনিং এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচও সমানভাবে বিবেচনা করতে হয়।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশ নতুন করে পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছে এবং প্রায় ৮০টি চুল্লির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। বৈশ্বিক এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো রূপপুর প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সফলভাবে পরিচালনা করা। একই সঙ্গে বিশাল ঋণের দায় পরিশোধ, স্বাধীন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান করাও দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।