
জরুরি কাজে বা আনন্দের জন্য ভ্রমণ করা অনেকের জীবনেরই অংশ। গর্ভবতী অবস্থায় ভ্রমণ করতে চাইলে আগে থেকে একটু সতর্ক পরিকল্পনা করে নিলে যাত্রা অনেকটাই নিরাপদ ও আরামদায়ক হয়। নিজের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সঠিক প্রস্তুতি নিলে দূরের পথেও মন শান্ত থাকে।
ভ্রমণের আগে প্রথমেই নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে নিন। দীর্ঘ পথ হাঁটা বা ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন। ব্যাগ যত হালকা রাখা যায় তত ভালো। সম্ভব হলে চাকা লাগানো ব্যাগ ব্যবহার করুন, যাতে বহন করতে কষ্ট না হয়। পানির বোতল, হালকা নাস্তা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতের কাছে রাখুন।
গর্ভাবস্থার কোন পর্যায়ে আছেন, তা ভেবে ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজান। শুরুর মাসগুলোতে অনেকের বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা বাড়তি ক্লান্তি থাকে, তখন দীর্ঘ ভ্রমণ কষ্টকর হতে পারে। মাঝের সময়টায় শরীর তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে বলে অনেক মা তখন ভ্রমণে বেশি স্বস্তি পান। শেষের মাসগুলোতে পেট ভারী হয়ে যায়, ঘন ঘন বিশ্রাম ও বাথরুমের প্রয়োজন হয়। নিজের শরীরের সংকেত বুঝে ভ্রমণের দূরত্ব ও সময় ঠিক করুন। যেকোনো পর্যায়ে লম্বা ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের মতামত নেওয়াই নিরাপদ।
যানবাহন বাছাইয়ের সময় আরামকে প্রাধান্য দিন। বাস বা ট্রেনে জানালার পাশের আসন বা মাঝখানে চলাচলের সুবিধা থাকা আসন বেছে নিন। দীর্ঘ যাত্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখুন। ব্যক্তিগত গাড়িতে ভ্রমণ করলে সিটবেল্ট ঠিকভাবে বাঁধুন, বেল্টের নিচের অংশ যেন পেটের নিচে থাকে।
বিমানে ভ্রমণ করলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখুন। সম্ভব হলে করিডোরের পাশের আসন বেছে নিন, যাতে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটতে বা বাথরুমে যেতে সুবিধা হয়। কেবিনের শুষ্ক বাতাসে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, তাই ফ্লাইটে নিয়মিত পানি পান করুন। দীর্ঘ ফ্লাইটে পা নাড়াচাড়া করুন এবং কিছুক্ষণ পরপর হাঁটুন। বমি ভাব থাকলে শুকনো বিস্কুট বা হালকা খাবার হাতের কাছে রাখুন। অনেক এয়ারলাইন্স গর্ভাবস্থার শেষ দিকে ভ্রমণে চিকিৎসকের ছাড়পত্র চায়, তাই টিকিট কাটার আগে নিয়ম জেনে নিন।
যাত্রাপথে খাওয়াদাওয়ায় সতর্ক থাকুন। অপরিচিত দোকানের খাবারের বদলে ঘরের বানানো হালকা খাবার নিয়ে যান। পানি সবসময় বিশুদ্ধ উৎস থেকে পান করুন। ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ফলের রস শরীরে স্বস্তি দিতে পারে। ভিড় এড়িয়ে চলুন এবং ধুলাবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করুন।
ভ্রমণের আগের দিন একটি চেকলিস্ট মিলিয়ে নিলে শেষ মুহূর্তের ভুলে যাওয়া এড়ানো যায়। তালিকায় রাখুন পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজ, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও সাম্প্রতিক রিপোর্টের কপি, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট, পানির বোতল, হালকা নাস্তা, এক সেট অতিরিক্ত পোশাক, জরুরি ফোন নম্বরের তালিকা, মোবাইল চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক, গলার বালিশ, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ব্যাগ গোছানোর সময় ভারী জিনিস নিচে ও হালকা জিনিস ওপরে রাখুন, যাতে খুঁজতে কষ্ট না হয়।
গন্তব্যে পৌঁছে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। প্রথম দিন ভারী কর্মসূচি না রেখে শরীরকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিন। কাছাকাছি চিকিৎসা সুবিধা কোথায় আছে, তা আগে থেকে জেনে রাখলে মনে ভরসা থাকে। পরিবারের কারও ফোন নম্বর হাতের কাছে রাখুন।
জরুরি পরিস্থিতির কথাও আগে থেকে ভেবে রাখুন। গন্তব্য এলাকার নিকটতম হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে রাখুন। সঙ্গে যিনি থাকছেন, তাকে আপনার শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসকের নাম ও জরুরি নম্বর জানিয়ে রাখুন। পেটে তীব্র ব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তপাত বা পানি ভাঙার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা সহায়তা নিন। ভ্রমণ বীমা থাকলে তার কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন। নিজের শরীরের প্রতি সতর্ক থাকাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
ভ্রমণের আগে নিজের চিকিৎসকের সঙ্গে একবার কথা বলে নেওয়া ভালো অভ্যাস। তিনি আপনার বর্তমান অবস্থা দেখে ভ্রমণ নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। ভ্রমণের কাগজপত্রের সঙ্গে নিয়মিত চেকআপের রিপোর্টের কপি রাখুন। দীর্ঘ ভ্রমণে শরীরে অস্বস্তি বা ক্লান্তি দেখা দিলে জোর করে এগিয়ে যাবেন না, বরং থেমে বিশ্রাম নিন। সঙ্গে থাকা কাউকে নিজের অবস্থা জানিয়ে রাখুন, যাতে প্রয়োজনে তিনি সাহায্য করতে পারেন।
ভ্রমণের সময় পোশাক নির্বাচনেও সতর্ক থাকুন। ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক পরুন এবং ভালো গ্রিপের জুতা বেছে নিন। হিল বা পিছলে যাওয়ার মতো জুতা এড়িয়ে চলুন। রাতে যাত্রা হলে ঘুমের জন্য গলার বালিশ নিতে পারেন। মোবাইল ফোন চার্জ রাখুন এবং জরুরি নম্বরগুলো সেভ করে রাখুন। ছোট এই প্রস্তুতিগুলো ভ্রমণকে করে তুলবে নিরাপদ ও আনন্দদায়ক।
ভ্রমণসঙ্গী নির্বাচনে সতর্ক থাকুন। এমন কাউকে সঙ্গে নিন যিনি আপনার শারীরিক অবস্থা বোঝেন এবং প্রয়োজনে দ্রুত সাহায্য করতে পারবেন। একা দীর্ঘ ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভালো। সঙ্গীকে আপনার চিকিৎসকের ফোন নম্বর, জরুরি যোগাযোগ ও নিয়মিত ওষুধের তালিকা জানিয়ে রাখুন। যাত্রাপথে সঙ্গীর সঙ্গে পালা করে বিশ্রাম নিন, যাতে দুজনেই সতেজ থাকেন।
ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরে শরীরকে পুরো বিশ্রাম দিন। প্রথম এক-দুই দিন ভারী কাজে হাত দেবেন না। পর্যাপ্ত ঘুমান, পুষ্টিকর খাবার খান ও প্রচুর পানি পান করুন। যাত্রার ক্লান্তি কাটতে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক। এই সময় শরীরে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ, যেমন অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অস্বস্তি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ভ্রমণের সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে রাখুন, কারণ মানসিক প্রশান্তি মা ও শিশু দুজনের জন্যই কল্যাণকর।
যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।