
গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরের ভারসাম্য অনেকটাই বদলে যায়। পেট ভারী হতে থাকায় পা পিছলে যাওয়া বা হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এই সময়ে ঘরের ভেতর ছোট কিছু পরিবর্তন এনে দিলে দৈনন্দিন জীবন হয় নিরাপদ ও স্বস্তির। পরিবারের সবার মিলিত যত্নেই নিরাপদ পরিবেশ গড়ে ওঠে।
বাথরুম থেকেই শুরু করা যাক। ভেজা মেঝে পা পিছলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। মেঝেতে নন-স্লিপ ম্যাট বা রাবারের পাটি বিছিয়ে নিন। সম্ভব হলে বাথরুমের দেয়ালে হ্যান্ডেল বা সাপোর্ট রেল লাগান, যাতে উঠবসায় ধরার মতো জায়গা থাকে। বসার টুল বা প্লাস্টিকের চেয়ার ব্যবহার করলে শাওয়ারের সময় ভারসাম্য ধরে রাখা সহজ হয়।
ঘরের আলো-বাতাসও গুরুত্বপূর্ণ। রাতে বাথরুম যাওয়ার পথে অন্ধকার থাকলে হোঁচট লাগতে পারে। করিডোরে ছোট নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে রাখুন। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা তার, খেলনা বা ছোট জিনিসপত্র সরিয়ে রাখুন। ভারী ফার্নিচার ধরে ঘোরা যায় এমনভাবে সাজান, যাতে চলাফেরায় ভর দেওয়ার জায়গা থাকে।
মাস যত বাড়বে, ঘরের ব্যবস্থাও তত বদলাতে হবে। শুরুর দিকে শরীরে তেমন ভার না থাকলেও বমি ভাব বা মাথা ঘোরার সময় বাথরুমের কাছাকাছি থাকা সুবিধাজনক। মাঝের মাসগুলোতে পেট বাড়তে শুরু করলে নিচু সোফা বা মোড়া থেকে ওঠা কঠিন হয়, তাই বসার জায়গায় শক্ত হাতল বা উঁচু চেয়ারের ব্যবস্থা রাখুন। শেষের দিকে রাতে বারবার বাথরুমে যেতে হয়, তাই শোবার ঘর থেকে বাথরুমের পথে কোনো বাধা রাখবেন না এবং রাতে হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখুন।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ রান্না করা কষ্টকর হতে পারে। উঁচু তাকে হাত বাড়িয়ে জিনিস নেওয়া এড়িয়ে চলুন। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের নাগালের তাকে রাখুন। ভারী হাঁড়িপাতিল তোলার কাজ পরিবারের অন্য কাউকে দিন। গরম চুলা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করুন এবং ভেন্টিলেশন ভালো রাখুন।
শোবার ঘরটা আরামের কেন্দ্র করে তুলুন। বিছানার দুপাশে অতিরিক্ত বালিশ রাখুন, যাতে পাশ ফিরে শোয়ার সময় পেটে ও পিঠে সাপোর্ট পাওয়া যায়। বিছানার পাশের টেবিলে পানির বোতল, টর্চ, ফোন চার্জার ও হালকা নাস্তা রাখুন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন, অতিরিক্ত গরমে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। মশারি টানানোর ব্যবস্থা আগে থেকে ঠিক করে রাখুন, যাতে রাতে উঠে ঝামেলা না হয়।
সিঁড়ি ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা দরকার। ধীরে ধীরে এক হাতে রেলিং ধরে ওঠানামা করুন। তাড়াহুড়ো একদম করবেন না। শোবার ঘরে বিছানার উচ্চতা এমন রাখুন যাতে ওঠাবসা সহজ হয়। বিছানার পাশে পানির বোতল ও টর্চ রেখে দিন।
ঘরের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাও দেখে নিন। খোলা তার বা ঢিলে সকেট থাকলে মেরামত করিয়ে নিন। পরিষ্কারের কড়া রাসায়নিক, কীটনাশক বা তীব্র গন্ধের স্প্রে শোবার ঘর বা রান্নাঘরের নাগালের বাইরে, উঁচু ও বন্ধ তাকে রাখুন। এগুলো ব্যবহারের সময় ঘরে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন এবং সম্ভব হলে পরিবারের অন্য কাউকে দিয়ে করান। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা ব্যবহারের পর নব বন্ধ আছে কি না, তা অভ্যাস করে দেখে নিন।
ঘরের বাইরেও সতর্ক থাকুন। ভেজা বারান্দা বা উঠানে খালি পায়ে হাঁটবেন না। ভালো গ্রিপের স্যান্ডেল ব্যবহার করুন। ছোট এই সতর্কতাগুলো মেনে চললে মা ও শিশু দুজনেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
সব সতর্কতার পরও পড়ে গেলে আতঙ্কিত হবেন না। প্রথমে শান্ত হয়ে শরীরের কোথাও ব্যথা বা অস্বস্তি আছে কি না বুঝুন। পেটে আঘাত লাগলে বা অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান বা ফোনে পরামর্শ নিন। ছোট হোঁচটে ভয় না পেলেও পরের চেকআপে চিকিৎসককে জানিয়ে রাখুন। বাড়িতে একা থাকলে পড়ে যাওয়ার পর কাউকে ফোন করে জানান।
ঘরের কাজ ভাগ করে নেওয়ার একটি সহজ তালিকা বানিয়ে নিন। ভারী কাজ যেমন বাজার বহন, পানি তোলা, ঘর মোছা, কাপড় নিংড়ানো এগুলো পরিবারের অন্য সদস্যরা করবেন। গর্ভবতী মা হালকা কাজ যেমন সবজি কাটা বা কাপড় ভাঁজ করা করতে পারেন, তবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নয়। সবার সম্মতিতে দায়িত্ব ভাগ হলে কারও ওপর চাপ পড়ে না এবং মা মানসিকভাবেও হালকা থাকেন।
এছাড়া ঘরে ধুলাবালি জমতে দেবেন না। নিয়মিত মেঝে মুছে পরিষ্কার রাখুন। তীব্র গন্ধের পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ব্যবহারের সময় ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন, অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা শরীরের জন্য কষ্টকর হতে পারে। পরিবারের সদস্যরা মিলে এই কাজগুলো ভাগ করে নিলে গর্ভবতী মায়ের ওপর চাপ পড়ে না এবং ঘর থাকে নিরাপদ।
রান্নাঘরে আগুন ও গ্যাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। চুলা জ্বালানোর সময় ঢিলে ওড়না বা আঁচল সামলে রাখুন। গরম তেল ছিটকে গায়ে লাগার ঝুঁকি থাকে, তাই ভাজার সময় দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রেশার কুকার ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। রান্নাঘরের মেঝে তেলতেলে হলে সঙ্গে সঙ্গে মুছে নিন। ছোটখাটো দুর্ঘটনা এড়াতে রান্নার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না।
আসন্ন শিশুর জন্য ঘরের এক কোণা আগে থেকে গুছিয়ে রাখুন। দোলনা বা খাটের জায়গা ঠিক করুন, যেখানে বাতাস চলাচল ভালো কিন্তু সরাসরি ঠান্ডা বাতাস লাগে না। শিশুর কাপড়, তোয়ালে ও প্রয়োজনীয় জিনিস আলাদা তাকে সাজিয়ে রাখুন। ঘরে অতিরিক্ত জিনিসপত্র কমিয়ে জায়গা খালি রাখুন, যাতে চলাফেরা সহজ হয়। এই প্রস্তুতি মাকে মানসিকভাবেও স্বস্তি দেয়।
যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।