সংক্ষেপে মূল তথ্য
- জিও প্ল্যাটফর্মসের ৩.২ বিলিয়ন ডলারের আইপিওতে বিদেশি অর্থপ্রবাহ আর রিজার্ভ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ডলারের বিপরীতে প্রায় ০.৫ শতাংশ বেড়ে ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে ভারতীয় রুপি।
- তবে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে ওঠা ব্রেন্ট ক্রুড আর দুর্বল শেয়ার বাজার রুপির বড় উত্থান আটকে দিয়েছে।
ডলারের বিপরীতে বড় লাফ দিয়ে ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাল ভারতীয় রুপি। বুধবার (২১ অক্টোবর) আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে রুপি আগের বন্ধ দামের তুলনায় প্রায় ০.৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ডলারে ৯৪.৪৩ থেকে ৯৪.৪৬ রুপিতে বন্ধ হয়েছে, সংবাদমাধ্যমভেদে বন্ধ দামে সামান্য এই পার্থক্য দেখা গেছে। দিনের লেনদেনে রুপি শুরু হয়েছিল ৯৪.৭৮ দিয়ে, এক পর্যায়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে গিয়ে আবার ৯৪.৮২ পর্যন্ত নেমেও এসেছিল। সেপ্টেম্বরের শুরুর পর এটাই রুপির সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান, এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর কাছাকাছি বন্ধ দাম দেখা গিয়েছিল। আগের সোমবার রুপি ২ পয়সা কমে ৯৪.৯১ তে বন্ধ হয়েছিল, আর মঙ্গলবার দুর্গাপূজার (দশেরা) ছুটির কারণে মুদ্রা বাজার বন্ধ ছিল।
এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিওর। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের এই টেলিকম ও ডিজিটাল কোম্পানির ৩.২ বিলিয়ন ডলারের আইপিও, টাকার অঙ্কে ৩০ হাজার ২১৩ কোটি রুপি, বুধবারই সাবস্ক্রিপশনের জন্য খোলে, আর দুই ঘণ্টারও কম সময়ে তা সম্পূর্ণ সাবস্ক্রাইব হয়ে যায়। এটি ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ার বিক্রি। আইপিওতে অংশ নিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ডলার ভেঙে রুপি কেনায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়, ফলে রুপির দাম চাঙা হয়। পাশাপাশি ডলারের চাহিদা সামলাতে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) হস্তক্ষেপও রুপিকে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছেন মুদ্রা বাজারের ব্যবসায়ীরা।
তবে দিনের লাভের পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি রুপি। দ্বিতীয়ার্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকা আর দেশীয় শেয়ার বাজারের পতন রুপির অগ্রগতি থমকে দেয়। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স ১.৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম ঠেলে তুলছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের কাছে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের দাবি না মানলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না তেহরান, এরপরই সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। আমদানি নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় তেলের দাম বাড়া মানেই ভারতের জন্য ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, যা রুপির ওপর চাপ তৈরি করে। সরকারি একটি ব্যাংকের এক ব্যবসায়ী রয়টার্সকে বলেছেন, তেলের দামের এই অস্থিরতা রুপিকে কিছুটা রক্ষণাত্মক রাখলেও অদূর ভবিষ্যতে বড় পতনের সম্ভাবনা কম।
শেয়ার বাজারেও দিনটা ছিল পতনের। নিফটি ৫০ সূচক ০.৭ শতাংশ কমে ২২ হাজার ৮১১.৩৫ পয়েন্টে বন্ধ হয়েছে, আর সেনসেক্স ১৪৩.২১ পয়েন্ট হারিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৭০৯.৬৯ পয়েন্টে। ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের অবস্থান মাপার ডলার সূচক প্রায় অপরিবর্তিত ছিল, এশিয়ার অন্য মুদ্রাগুলোও সীমিত গণ্ডির মধ্যেই ওঠানামা করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রুপির সামনের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে এই টানাপোড়েনের ওপরে। মিরে অ্যাসেট শেয়ারখানের গবেষণা বিশ্লেষক অনুজ চৌধুরী বলেছেন, আইপিও কেন্দ্রিক বিদেশি অর্থপ্রবাহ আর তুলনামূলক দুর্বল ডলারে রুপি ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চে উঠলেও দেশীয় বাজারের দুর্বলতা আর বাড়তি তেলের দাম বড় উত্থান আটকে দিয়েছে। ডলারের সামগ্রিক দুর্বলতা আর মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড নরম হতে থাকায় রুপি ইতিবাচক ধারায় লেনদেন করতে পারে বলে মনে করেন তিনি, তার ধারণায় ডলার ও রুপির স্পট দাম ৯৪.২০ থেকে ৯৪.৮০ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। সিআর ফরেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমিত পাবারি বলেছেন, ডলার ও রুপির হার ৯৫ এর নিচে ধরে রাখতে পারলে নজর যাবে ৯৪.৮০ থেকে ৯৪.৭০ এর দিকে, আর সেই বাধা টেকসইভাবে ভাঙলে আগামী সপ্তাহগুলোতে ৯৪ এর পথ খুলতে পারে।
এখন সবার নজর রিজার্ভ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি পর্যালোচনার কার্যবিবরণীর দিকে। চলতি মাসের ৭ তারিখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুদের হার বাড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ থাকায় সামনে আরও হার বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছে তারা। গত সপ্তাহে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে ভারতের খুচরা মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেড়ে ৫.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। সোয়াপ বাজারে আগামী ১২ মাসে ১০০ বেসিস পয়েন্টেরও বেশি হার বাড়ানোর প্রত্যাশা এরই মধ্যে মূল্যায়িত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী রুপি আমদানি করা পণ্যের দামবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, অপরিশোধিত তেল, ইলেকট্রনিক্স আর অন্যান্য কাঁচামাল আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর মুদ্রাজনিত খরচ কমায়। বিমান চলাচল আর তেল বিপণন খাতও এর সুফল পেতে পারে, যদিও প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে প্রতিটি কোম্পানির হেজিং অবস্থান আর মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ওপরে।