
ঢাকা: করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাত ধোয়ার বিষয়ে দেশজুড়ে যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হয়েছিল, মহামারি কমে যাওয়ার পর সেই অভ্যাসে মারাত্মক ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের বাড়িতে হাত ধোয়ার স্থানে সাবান ও পানির সুবিধা রয়েছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অপর্যাপ্ত হাতের স্বাস্থ্যবিধির কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে অপর্যাপ্ত হাতের স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে সম্পর্কিত ডায়রিয়ায় বিশ্বে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার এবং শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণে প্রায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেবল এই দুটি রোগেই মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। এছাড়া ডব্লিউএইচও-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অভাবে বিশ্বে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুই ছিল ৩ লাখ ১৯৯৫ হাজার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত না ধুলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অপরিষ্কার হাতে খাবার খাওয়া কিংবা হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করার মাধ্যমে জীবাণু সহজেই শরীরে প্রবেশ করে। এ বিষয়ে আইসিডিডিআর,বি-এর এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ রিসার্চ গ্রুপের সহযোগী বিজ্ঞানী ড. মো. নুহু আমিন বলেন, কোভিডের সময় সচেতনতা তৈরির পর মানুষ যেভাবে হাত ধোয়াকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল, সেখান থেকে বর্তমানে তারা সরে এসেছে। এর অন্যতম মূল কারণ হলো হাত ধোয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাবান ও পানির নিয়মিত সরবরাহ না থাকা।
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় হাতের পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে এক রোগী থেকে অন্য রোগীর শরীরে জীবাণু ছড়িয়ে হাসপাতালে অর্জিত সংক্রমণ (হসপিটাল-অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন) হতে পারে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রতি ১০০ জন রোগীর মধ্যে গড়ে ১৫ জন হাসপাতাল থেকে নতুন কোনো রোগে আক্রান্ত হন। এসব সংক্রমণের কারণে চিকিৎসার ব্যয় এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়ে যায়, যা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলি হালদার জানান, অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও সর্দি-কাশির মতো সংক্রামক রোগ ছড়ায়। বারবার সংক্রমণে আক্রান্ত হলে শিশুদের পুষ্টির অবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, হাত ধোয়াকে শুধু মহামারির সময়ের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে চলবে না; একে দৈনন্দিন জীবনের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সাবান দিয়ে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার চর্চা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।