
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং ডিজিটাল কমার্সের অভূতপূর্ব প্রসারে বিশ্ব অর্থনীতির রূপ বদলে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের আইসিটি খাতের আকার বর্তমানে ৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে তা ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর সাথে তাল মিলিয়ে দেশের ই-কমার্স খাতের বাজার আকার ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
করোনা মহামারির পর থেকে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। ইলেকট্রনিক্স, ফ্যাশন এবং গ্রোসারি পণ্যের পাশাপাশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বা এমএফএস এবং কুরিয়ার লজিস্টিকসের বদৌলতে এই বাজার এখন আর শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এছাড়া সোশ্যাল কমার্স বা এফ-কমার্সের মাধ্যমে লাখ লাখ নারী উদ্যোক্তা ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এআই-চালিত মার্কেটিং টুলস এবং সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা তাদের ব্যবসা প্রসারে বড় ভূমিকা পালন করছে।
ই-কমার্স খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব প্রয়োগ ব্যবসায়িক পরিচালন দক্ষতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলোতে হাইপার পারসোনালাইজেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রেতার পছন্দ বিশ্লেষণ করে পণ্য দেখানো হচ্ছে, যা বিক্রির সম্ভাবনা দ্বিগুণ করছে। এ বিষয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে গুদাম ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস রুট অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হচ্ছে। তবে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে প্রথাগত ডেটা এন্ট্রি বা সাধারণ কনটেন্ট রাইটিংয়ের মতো ফ্রিল্যান্সিং কাজগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তির এই অগ্রগতির পাশাপাশি ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং এবং অনলাইন প্রতারণার মতো সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজিটাল লেনদেন সুরক্ষিত রাখতে কঠোর ডেটা প্রাইভেসি আইন এবং একটি যুগোপযোগী জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার জন্য নিজস্ব ডেটা ব্যবহার করে উচ্চমানের বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা।
প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে কেবল ভোক্তা হিসেবে নয়, বরং ইনোভেশনের মালিকানা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় আপস্কিলিং ও রিস্কিলিংয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে হবে। সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (সিডিসিআরএ)-এর মতো স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পলিসি সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই এআই বিপ্লব বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।