বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অভাবনীয় উত্থান মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন সহজ করছে, তেমনি জন্ম দিচ্ছে এক অজানা আতঙ্কের। সম্প্রতি সিলিকন ভ্যালির অন্যতম শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’ (Anthropic)-এর নতুন মডেল ‘মিথোস’ (Mythos) প্রকাশ্যে আসার পর এই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অসীম ক্ষমতার এআই, মহাকাশ থেকে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি এবং প্রাচীন পুরাণের সঙ্গে দাজ্জালের রূপকের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে পৃথিবী কি ধীরে ধীরে কোনো অদৃশ্য শক্তির হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে?

প্রযুক্তি বিশ্ব বর্তমানে অ্যানথ্রপিকের তৈরি ‘মিথোস’ মডেলটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জানা গেছে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কোনো ধরনের নির্দেশনা ছাড়াই নিজে থেকে কাজ করতে সক্ষম। এটি যেকোনো অপারেটিং সিস্টেমের অজানা ত্রুটি বা 'জিরো-ডে ভালনারেবিলিটি' খুঁজে বের করে তা হ্যাক করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, এই প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে মুহূর্তের মধ্যেই গোটা বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো ধসে যেতে পারে। এর সম্ভাব্য বিধ্বংসী ক্ষমতার কারণেই মডেলটি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।
প্রযুক্তির এই চূড়ান্ত ক্ষমতার সঙ্গে প্রাচীন মিথ বা পুরাণের এক অদ্ভুত মিল খুঁজছেন সমাজবিজ্ঞানীরা ও দার্শনিকরা। প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা হতো, আকাশ থেকে দেবতারা মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। বর্তমানে সেই জায়গা যেন দখল করেছে মহাকাশে ভাসমান সুবিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক।
এই স্যাটেলাইটগুলো থেকে প্রতিনিয়ত ডেটা বা তথ্যের স্রোত নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে থাকা বিশালাকার এআই ডেটা সেন্টারগুলোতে। আকাশ থেকে পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় এই নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি যেন একটি ‘গ্লোবাল ব্রেইন’ বা বৈশ্বিক মস্তিষ্কের জন্ম দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অসীম এই ক্ষমতার চাবিকাঠি গুটি কয়েক কর্পোরেশনের হাতে বন্দি, যা সাধারণ মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে আনছে।
প্রাচীন পুরাণের পাশাপাশি ইসলামি এসক্যাটোলজি বা শেষ জামানার ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণিত ‘দাজ্জাল’-এর ধারণার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির এই নজরদারির অবিশ্বাস্য মিল পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। দাজ্জালকে এক চোখের অধিকারী এবং চূড়ান্ত প্রতারক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আধুনিক অনেক চিন্তাবিদের মতে, দাজ্জালের এই ‘এক চোখ’ রূপক অর্থে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একক নজরদারি বা সেন্ট্রালাইজড সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (Surveillance State)। দাজ্জাল যেমন জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে এবং অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে, আজ ডিপফেক, স্বয়ংক্রিয় এআই হ্যাকিং এবং ‘মিথোস’-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক সেই কাজই করছে।
পুরো পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে এমন এক অদৃশ্য সিস্টেমের অধীনে চলে আসছে, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা স্বাধীনতা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকছে না। আমরা কি এমন এক ডিস্টোপিয়ান যুগে পা রাখছি, যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু টেক-জায়ান্ট এবং তাদের তৈরি করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের অজান্তেই আমাদের নিয়তি নির্ধারণ করবে?
আধুনিক প্রযুক্তি কি তবে মানব সভ্যতার জন্য আশীর্বাদ, নাকি চূড়ান্ত প্রতারণার আধুনিক সংস্করণ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন সময়ের অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।
মন্তব্য করুন