
ঢাকা: অভাবের তাড়নায় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে লড়াই করে চলা এক অদম্য নারীর নাম হালিমা বেগম। বয়স ৩৯ বছর। পঙ্গু স্বামী ও চার সন্তানের সংসার চালাতে তিনি বেছে নিয়েছেন কঠোর পরিশ্রমের পথ। দিনের বেলা রাজধানীর রাজপথে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান আর রাতে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করেন হালিমা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই নারী বিগত সাত-আট বছর ধরে এভাবেই নিজের ও পরিবারের চাকা সচল রেখেছেন।
হালিমার জীবনের শুরু থেকেই ছিল নানা প্রতিকূলতা। চার বছর বয়সে রেলস্টেশন থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর কেটেছিল তার শৈশবের কষ্টের দিনগুলো। রাস্তায় ভিক্ষা করা এবং প্লাস্টিক কুড়ানোর মধ্য দিয়ে তিন বছর পর তিনি নিজ বাবা-মাকে খুঁজে পান। অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সুখেই কাটছিল দিন। কিন্তু করোনা মহামারির ঠিক আগে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা ত্রুটির কারণে পঙ্গু হয়ে যান তার স্বামী। এর পরপরই করোনা মহামারির থাবায় বন্ধ হয়ে যায় আয়ের সব পথ। পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে বাধ্য হয়ে রিকশার হ্যান্ডেল তুলে নেন হালিমা।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে হালিমা তার কঠিন সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে জানান, সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই তিনি সন্তানদের মানুষ করতে চান। তিনি বলেন,
আমার মতো কষ্ট যেন আমার সন্তানদের করা না লাগে, সেই কারণেই এত খাটনি করি। খারাপ পথে যাওয়ার জন্য অনেকে নানা প্রলোভন দেখালেও আমি সেসব ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ আমি চাই আমার সন্তানেরা যেন সৎ পথে বড় হয়।শুরুতে পুরুষদের পোশাক পরে মুখে রুমাল পেঁচিয়ে রিকশা চালাতে গিয়ে তাকে বহুবার হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু পেটের দায়ে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে তিনি পিছু হটেননি।
হালিমার বড় দুই মেয়েকে কোরআনে হাফেজা বানানোর পাশাপাশি সাধারণ বিদ্যালয়েও ভর্তি করা হয়েছে। সন্তানদের লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া এবং অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা খরচ জোগাতে তাকে প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নামমাত্র বেতন পেলেও তা দিয়ে ঘরভাড়া ও সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়ায়চালিত রিকশা চালিয়ে বাড়তি আয় করেন তিনি। এর আগে একটি সংস্থা তাকে রিকশা দিলেও গ্যারেজ থেকে তা চুরি হয়ে যায়। তবুও তিনি দমে যাননি, সততার সঙ্গে কাজ করে সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন দেখছেন।
বর্তমানে কোনো ধরনের সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান না হালিমা বেগম। মানুষের কাছে হাত পাততেও তার অনীহা রয়েছে। তিনি কেবল একটি সম্মানজনক কাজের বা একটি রিকশার প্রত্যাশা করেন, যার মাধ্যমে তিনি তার সততার জীবিকা অব্যাহত রাখতে পারেন। শত কষ্টের মাঝেও হালিমার এই জীবন সংগ্রাম সমাজের প্রতিটি স্তরে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।