গুলশান লেকপাড়ের যে জায়গায় একসময় দাঁড়িয়ে ছিল হোলি আর্টিজান বেকারি, সেখানে আজ উঠে গেছে বহুতল ভবন। বাইরে থেকে তাকালে বোঝার উপায় নেই, ঠিক এক দশক আগে এই জায়গাটিই হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার কেন্দ্র। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সন্ধ্যায় অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণ ঢুকে পড়েছিল অভিজাত এই রেস্তোরাঁয়, শুরু হয়েছিল দীর্ঘ জিম্মি সংকট।
রাতভর পুলিশ, র্যাব, সোয়াট আর বিজিবি ঘিরে রেখেছিল এলাকা। বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন জিম্মিদের স্বজনেরা, কেউ জানতেন না ভেতরে তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না। পরদিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। অল্প সময়েই অভিযান শেষ হলেও তারপর স্পষ্ট হয় ভয়াবহতা, রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার হয় ২০ জিম্মির লাশ, যাদের মধ্যে ছিলেন ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, একজন ভারতীয় ও তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক। দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২।
হামলার দায় সেই রাতেই স্বীকার করে নেয় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস, যদিও তৎকালীন সরকার একে দেশীয় সংগঠন নব্য জেএমবির কাজ বলে চিহ্নিত করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, হামলার মূল সমন্বয়ক ছিলেন কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তামিম আহমেদ চৌধুরী। সরাসরি হামলাকারী পাঁচ তরুণের তিনজনই ছিলেন ঢাকার সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান, যা তখন গোটা সমাজকে হতবাক করে দিয়েছিল।
হামলার ছয় দিন পর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় আরেকটি হামলার চেষ্টা হয়, যা একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে পরে জানা যায়। এরপর দেশজুড়ে চলে ধারাবাহিক অভিযান, ২০১৬ সালের আগস্টে নারায়ণগঞ্জে নিহত হন তামিম চৌধুরী নিজেই। ২০১৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন, পরে হাইকোর্ট তা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করেন।
গত এক দশকে বাংলাদেশে ওই মাত্রার আর কোনো হামলা হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংগঠন ভেঙে দেওয়া গেলেও উগ্রবাদী মতাদর্শ, অনলাইন প্ররোচনা আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভিত্তি ভাঙতে এখনো লাগবে দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তাই গুলশানের সেই রাত আজও শুধু শোকের স্মৃতি নয়, রাষ্ট্র আর সমাজের জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা হয়ে রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন