
আইন এবং কড়া বিধিমালা থাকলেও দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব স্তরের ফার্মেসি, সুপারশপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অবাধে বিক্রি হচ্ছে শিশুদের ফর্মুলা দুধ। বিশেষ শারীরিক জটিলতায় চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহারের বিধান থাকলেও, সাধারণ পণ্যের মতো এর অতিমাত্রায় সহজলভ্যতার কারণে এটি এখন বছরে অন্তত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বাজারে পরিণত হয়েছে। ফলস্বরূপ, দেশে নবজাতকদের এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং বা শুধু মায়ের দুধ পানের হার মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা শিশুদের সামগ্রিক পুষ্টি সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (BDHS) তথ্য অনুযায়ী, শূন্য থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুর শুধু মায়ের দুধ পানের হার ১৯৬৫ থেকে কমে বর্তমানে ৫৫ থেকে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। পুষ্টিবিদ ও শিশুবিশেষর্গরা এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন মাঠপর্যায়ে আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব, চিকিৎসকদের একাংশের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচারকে। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. এস. কে. রায় জানান, সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব এবং আইনের প্রয়োগ না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফর্মুলা দুধের আগ্রাসন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
মাতৃদুগ্ধ বিকল্প আইন, ২০১৩ ও বিধিমালা, ২০১৭ অনুযায়ী একান্ত অপরিহার্য ক্ষেত্র ছাড়া বিএমডিসির নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতিরেকে এই খাদ্য বিক্রির কোনো আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু রাজধানীর গুলশান, মিরপুর ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন বাজারের দোকানগুলোতে প্রকাশ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এসব পণ্য। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, 'প্রেসক্রিপশন ছাড়া এসব পণ্য বিক্রির কোনো আইনি সুযোগ নেই, তবে আমাদের সরাসরি অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা না থাকায় মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহযোগিতা নেওয়া হয়।'
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ চিকিৎসক কোম্পানির কাছ থেকে প্রণোদনা নিয়ে এবং ৪৪ শতাংশ চিকিৎসক কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ফর্মুলা দুধের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন। বিশিষ্ট শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সোফিয়া খাতুন এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'কোম্পানির সামান্য উপহার ও লোভের বশে কিছু চিকিৎসক অবুঝ শিশুদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।'
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবের মডেল অনুসরণ করে একটি নতুন গাইডলাইনের প্রস্তাবনা সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি পুষ্টিবিদদের সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধ পানের হার পুনরুদ্ধার করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু ও হামের দ্বৈত ঝুঁকি মোকাবিলায় চাই বাড়তি সচেতনতা
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।