
কার্তিক মাস প্রায় শেষের পথে। সকালে হালকা কুয়াশা, রাতে ঠান্ডা বাতাস জানান দিচ্ছে, শীত আর দূরে নেই। প্রতিবছর শীত পড়ার পর তাড়াহুড়ো করে কম্বল বের করা আর গরম কাপড় খোঁজার ঝামেলা এড়াতে চাইলে এখনই সময় ঘরের প্রস্তুতি সেরে নেওয়ার। একটু পরিকল্পনা করে কাজগুলো সেরে রাখলে শীতের সকালগুলো হবে আরামদায়ক।
প্রথম কাজ, লেপ-কম্বল রোদে দেওয়া। সারা বছর আলমারিতে পড়ে থাকা লেপ-কম্বলে জমে থাকে ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে ভাব। দুই-তিন দিন কড়া রোদে দিয়ে ভালো করে ঝেড়ে নিন। সম্ভব হলে কভারগুলো ধুয়ে নিন। এতে শীতের রাতে আরামে ঘুম হবে, আর ধুলোবালি থেকে হওয়া অস্বস্তিও কমবে অনেকটা। একটা সাধারণ ভুল হলো স্যাঁতসেঁতে লেপ না শুকিয়েই ব্যবহার করা। এতে ঠান্ডা লাগার পাশাপাশি চুলকানির মতো অস্বস্তিও হতে পারে। তাই রোদে দেওয়ার কাজটা অবহেলা করবেন না।
এরপর পালা গরম কাপড়ের। সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল বের করে রোদে দিন, প্রয়োজনে ধুয়ে নিন। ছোটদের কাপড়গুলো মাপমতো আছে কি না দেখে নিন, কারণ এক বছরে বাচ্চারা অনেকটা বেড়ে যায়। যেগুলো ছোট হয়ে গেছে, সেগুলো প্রয়োজনে কাউকে দিয়ে দিন। এতে আলমারিও গোছানো থাকবে। শীতের কাপড় কেনার পরিকল্পনা থাকলে এখনই কিনে ফেলুন। শীত জেঁকে বসলে দাম বাড়ে, আর পছন্দের জিনিসও পাওয়া কঠিন হয়। তালিকা করে কেনাকাটা করলে অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানো যায়।
ঘরের পর্দা বদলে মোটা কাপড়ের পর্দা লাগান। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকলে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। দরজা-জানালার ফাঁকগুলো পরীক্ষা করে দেখুন। পুরনো বাড়িতে জানালার কাঠ ফাঁক হয়ে গেলে সেখানে কাপড় গুঁজে বা টেপ লাগিয়ে বন্ধ করা যায়। ফ্যানের ব্লেড পরিষ্কার করে রাখুন, শীতকালে ফ্যান কম চললেও ধুলো জমে থাকে। ঘরের কোণে জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলুন, শীতের সকালে ঘর গোছানো থাকলে মনও ভালো থাকে।
রান্নাঘরের দিকেও নজর দিন। শীতকালে গরম পানির চাহিদা বাড়ে, তাই পানি গরমের ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না দেখে নিন। গিজার বা হিটার থাকলে আগেই চালিয়ে পরীক্ষা করে নিন, নষ্ট থাকলে মেরামতের সময় পাবেন। চা-কফির সরঞ্জাম হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন। শীতের সবজি সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজটা পরিষ্কার করে রাখা ভালো। ফ্রিজের পেছনে জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার করলে বিদ্যুৎ খরচও কিছুটা কমে।
বাথরুমের প্রস্তুতিও জরুরি। শীতকালে ঠান্ডা মেঝেতে পা দিলে অস্বস্তি হয়, তাই বাথরুমের সামনে পাপোশ রাখুন। গরম পানির ব্যবস্থা না থাকলে অন্তত সকালের জন্য পানি গরমের বিকল্প ঠিক করে রাখুন। বয়স্কদের জন্য বাথরুমে হাতল বা সাপোর্টের ব্যবস্থা থাকলে নিরাপদ হয়, কারণ শীতে পেশি শক্ত হয়ে পিছলে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সবশেষে শীতের সকালের জন্য ছোট্ট আয়োজন। গরম কাপড় বিছানার পাশে রাখুন, যাতে ভোরে উঠে ঠান্ডায় কষ্ট না হয়। বয়স্ক ও শিশুদের ঘরটা একটু বেশি উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা করুন। বয়স্কদের জন্য মোটা কম্বলের পাশাপাশি পায়ের মোজা রাখুন, কারণ তাদের পায়ে ঠান্ডা বেশি লাগে। শিশুদের ঘুমানোর আগে গরম দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস থাকলে ভালো। এই ছোট ছোট প্রস্তুতিই শীতকালকে করে তুলবে উপভোগ্য ও ঝামেলামুক্ত।
স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের শীতের ইউনিফর্ম আর মোজা আগেই গুছিয়ে রাখুন, যাতে সকালে তাড়াহুড়ো না হয়। টিফিনের জন্য গরম খাবার রাখার ফ্লাস্কটা পরীক্ষা করে নিন। গ্রামের বাড়িতে থাকলে গোয়ালঘর আর হাঁস-মুরগির খোঁয়াড় মেরামত করে নিন। পশুপাখির ঘরে শুকনো খড় বিছিয়ে দিলে ওরা আরামে থাকবে। শীতকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে কাজে লাগে, তাই মোমবাতি বা চার্জার লাইট হাতের কাছে রাখুন। মোবাইলের চার্জার পাওয়ার ব্যাংকটাও চার্জ দিয়ে রাখুন।
শীতের ত্বকের যত্নের কথাও ভুলবেন না। শীতকালে বাতাস শুষ্ক হয়ে ত্বক ফেটে যায়। গোসলের পর শরীরে ময়েশ্চারাইজার বা সরষের তেল মাখার অভ্যাস করুন। ঠোঁট ফাটা রোধে লিপবাম হাতের কাছে রাখুন। প্রচুর পানি পান করুন, শীতকালে তৃষ্ণা কম লাগলেও শরীরে পানির দরকার থাকে। গরম স্যুপ বা ডালের পানি শীতের সন্ধ্যায় শরীর গরম রাখে।
এই প্রস্তুতিগুলো সেরে রাখলে শীতের সকাল হবে নিশ্চিন্ত, আর পুরো মৌসুম কাটবে আরামে। শীতের সকালের নরম রোদে বসে চা খাওয়ার মজাটাই আলাদা, প্রস্তুতি থাকলে সেই আনন্দ দ্বিগুণ হয়। একটা তালিকা কাগজে লিখে ফ্রিজে সেঁটে রাখুন, কাজ শেষ হলে টিক দিন। এতে কোনো কাজ বাদ পড়বে না, আর পুরো পরিবার মিলে প্রস্তুতি নিলে কাজও হবে দ্রুত।
কয়েকটা সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলুন। অনেকে শীত পড়ার পর একদিনে সব কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খান। কাজগুলো সপ্তাহজুড়ে ভাগ করে নিন। আরেকটা ভুল হলো পুরনো লেপ-কম্বল না ধুয়েই তুলে রাখা পরের বছরের জন্য। ব্যবহারের পর ধুয়ে, শুকিয়ে, ন্যাপথলিন দিয়ে রাখলে পরের বছর আর ঝামেলা থাকবে না। শীতের কাপড় কেনার সময় শুধু দাম না দেখে কাপড়ের মানও দেখুন, ভালো মানের একটা সোয়েটার কয়েক বছর চলে। শীত আসার আগের এই গোছানো সময়টাই আসলে শীত উপভোগের প্রথম ধাপ। প্রস্তুতি শেষ হলে নিজেকে এক কাপ গরম চা দিয়ে পুরস্কার দিন, আপনি তা পাওয়ার যোগ্য। আর মনে রাখবেন, শীতকাল শুধু ঠান্ডার মৌসুম নয়, পিঠা-পুলির উৎসবেরও সময়। প্রস্তুতি নেওয়ার ফাঁকে পরিবারের সঙ্গে বসে শীতের পিঠার পরিকল্পনাও সেরে নিন।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।